রামায়ণের বিশাল আখ্যানে আমরা সীতার হরণ এবং তাঁর উদ্ধারের কাহিনীকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখি। কিন্তু এই মহাকাব্যের গভীরে এমন কিছু নারী চরিত্র রয়েছেন, যাঁদের আত্মত্যাগ এবং লাঞ্ছনা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। কিষ্কিন্ধ্যার রাজবধূ এবং সুগ্রীবের সহধর্মিণী রুমা তেমনই একজন স্বল্পালোচিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বালী ও সুগ্রীবের ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের মূলে কেবল রাজ্যলাভ ছিল না, বরং রুমার সম্মান রক্ষা এবং অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।

রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে রুমার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন বানররাজ সুগ্রীবের পরমাসুন্দরী এবং পতিব্রতা স্ত্রী। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী বালী ও সুগ্রীব অত্যন্ত স্নেহের সাথে রাজ্য পরিচালনা করলেও একটি ভুল বোঝাবুঝি তাঁদের জীবনকে তছনছ করে দেয়। আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রে এসে পড়েন রুমা।
রুমার বন্দিদশা ও বালীর অধর্ম
কাহিনীটি শুরু হয় যখন মায়াবী নামক এক অসুরের সাথে বালীর যুদ্ধ বাধে। বালী অসুরকে তাড়া করে একটি গুহার ভেতর প্রবেশ করেন এবং সুগ্রীবকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর গুহা থেকে রক্ত নির্গত হতে দেখে সুগ্রীব ভাবেন বালী নিহত হয়েছেন। তিনি গুহার মুখ বন্ধ করে কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে আসেন এবং মন্ত্রীদের অনুরোধে সিংহাসনে বসেন।
কিছুকাল পর বালী ফিরে এসে দেখেন সুগ্রীব রাজা হয়েছেন। ক্রোধোন্মত্ত বালী সুগ্রীবের কোনো যুক্তি না শুনেই তাঁকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। কিন্তু বালীর অন্যায় এখানেই শেষ হয়নি। তিনি শাস্ত্র ও নীতি বিরুদ্ধভাবে অনুজ সুগ্রীবের জীবিতাবস্থায় তাঁর স্ত্রী রুমাকে জোরপূর্বক কেড়ে নেন এবং নিজের অন্তঃপুরে বন্দি করেন। ভারতীয় শাস্ত্র অনুযায়ী, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী কন্যার সমান। বালীর এই কাজ ছিল চরম 'অধর্ম'।
সুগ্রীবের হাহাকার ও শ্রীরামের আগমন
নিজের রাজ্য এবং প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে সুগ্রীব ঋষ্যমুখ পর্বতে আশ্রয় নেন। হনুমান ও অন্যান্য সঙ্গীদের নিয়ে তিনি যখন দিশেহারা, তখনই সেখানে রাম ও লক্ষ্মণের আগমন ঘটে। সুগ্রীব শ্রীরামের কাছে তাঁর দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করার সময় রুমার কথা বারবার উল্লেখ করেন। সুগ্রীবের করুণ আর্তি শুনে এবং বালীর এই নীতিবহির্ভূত আচরণের কথা জেনে রাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি সুগ্রীবকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি বালীকে শাস্তি দেবেন এবং রুমাকে তাঁর স্বামীর কাছে ফিরিয়ে আনবেন।
বালীর পতন ও রুমার মুক্তি
{{/usCountry}}নিজের রাজ্য এবং প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে সুগ্রীব ঋষ্যমুখ পর্বতে আশ্রয় নেন। হনুমান ও অন্যান্য সঙ্গীদের নিয়ে তিনি যখন দিশেহারা, তখনই সেখানে রাম ও লক্ষ্মণের আগমন ঘটে। সুগ্রীব শ্রীরামের কাছে তাঁর দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করার সময় রুমার কথা বারবার উল্লেখ করেন। সুগ্রীবের করুণ আর্তি শুনে এবং বালীর এই নীতিবহির্ভূত আচরণের কথা জেনে রাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি সুগ্রীবকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি বালীকে শাস্তি দেবেন এবং রুমাকে তাঁর স্বামীর কাছে ফিরিয়ে আনবেন।
বালীর পতন ও রুমার মুক্তি
{{/usCountry}}রাম ও সুগ্রীবের মিত্রতার পর শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক দ্বৈরথ। শ্রীরামের শরাঘাতে বালীর পতন ঘটে। মৃত্যুর আগে বালী তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। বালীর মৃত্যুর পর সুগ্রীব কিষ্কিন্ধ্যার রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। এর পরেই দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান রুমা। সুগ্রীবের প্রধানা মহিষী হিসেবে তিনি পুনরায় সসম্মানে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন। রামায়ণের পরবর্তী অংশে দেখা যায়, সুগ্রীব যখন সীতা অন্বেষণে রামকে সাহায্য করছিলেন, তখন রুমা এবং তারা (বালীর স্ত্রী) উভয়েই প্রাসাদে থেকে সুগ্রীবকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতেন।
কেন রুমার কাহিনি গুরুত্বপূর্ণ?
রুমার চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতা বা বীরত্ব যখন নীতি হারায় (যেমনটা বালীর ক্ষেত্রে হয়েছিল), তখন তা ধ্বংস অনিবার্য করে তোলে। সুগ্রীবের প্রতি রুমার আনুগত্য এবং সেই কঠিন সময়েও নিজের মর্যাদা ধরে রাখা তাঁকে রামায়ণের অন্যতম আদর্শ নারী চরিত্রে উন্নীত করেছে। যদিও মন্দোদরী বা তারার মতো তাঁর কথা খুব বেশি চর্চিত হয় না, তবুও রুমার অধিকার পুনরুদ্ধারই ছিল সুগ্রীবের জীবনে রামের আশীর্বাদ লাভের অন্যতম কারণ।