রামায়ণের এক বীরত্বগাথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে জটায়ুর ছবি, যিনি সীতাকে উদ্ধারের প্রচেষ্টায় রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। কিন্তু জটায়ুর এই ত্যাগের নেপথ্যে এক মহান বড় ভাইয়ের আশীর্বাদ ও আত্মত্যাগের কাহিনী অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজানা। তিনি হলেন সম্পাতি। যিনি কেবল নিজের ডানা হারিয়ে জটায়ুকে রক্ষা করেননি, বরং পরবর্তীকালে রামভক্ত হনুমানকে সীতার হদিশ দিয়ে লঙ্কাকান্ডে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

জটায়ুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সম্পাতির করুণ অথচ বীরত্বপূর্ণ জীবনগাথা অনেকেই জানেন না। তাঁর আত্মত্যাগ ও পুনর্জন্ম, সূর্যতাপে ডানা হারিয়ে যেভাবে রামের সহায় হয়েছিলেন জটায়ুর বড় ভাই, সেই কাহিনি এখান থেকে জেনে নিন।
সম্পাতি ও জটায়ু ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও বিনতার পুত্র (কারও মতে অরুণের পুত্র)। পক্ষীরাজ সম্পাতি ছিলেন অসীম শক্তিশালী এবং তাঁর দৃষ্টি ছিল বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বাল্যকালে দুই ভাই নিজেদের মধ্যে শক্তির প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলেন। কে কত উঁচুতে উড়তে পারে, তা দেখতে দেখতে তাঁরা একদিন আকাশের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যান।
ভাইয়ের জন্য নিজের ডানা বিসর্জন
উড়তে উড়তে তাঁরা সূর্যের খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন। সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে কনিষ্ঠ ভ্রাতা জটায়ুর ডানা পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ছোট ভাইকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সম্পাতি নিজের বিশাল ডানা দুটি মেলে ধরেন জটায়ুর ওপর। ফলস্বরূপ, জটায়ু রক্ষা পেলেও সূর্যের দহনে সম্পাতির দুই ডানা পুরোপুরি পুড়ে যায়। ডানা হারিয়ে তিনি দক্ষিণ ভারতের মহেন্দ্র পর্বতের ওপর আছড়ে পড়েন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি সেখানে নিঃসঙ্গ ও অক্ষম অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাঁর বীরত্ব ও অহংকার সূর্যতাপে বিলীন হয়ে গেলেও রয়ে গিয়েছিল তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং ধৈর্য।
সীতা অন্বেষণে হনুমানের সাথে সাক্ষাৎ
রামায়ণের কিষ্কিন্ধা কাণ্ডে যখন অঙ্গদ, হনুমান ও জাম্ববান সীতার খোঁজে দক্ষিণ দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন তাঁরা সমুদ্রতীরে হতাশ হয়ে বসে পড়েন। তাঁরা যখন জটায়ুর বীরত্ব ও মৃত্যুর কথা আলোচনা করছিলেন, তখন পাহাড়ের গুহা থেকে এক বিশাল পক্ষী দেহ টেনে টেনে বেরিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন ডানাভাঙ্গা সম্পাতি। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি অত্যন্ত শোকাতুর হন এবং রামের দূতদের নিজের পরিচয় দেন।
দূরদৃষ্টি ও লঙ্কার হদিশ
{{/usCountry}}রামায়ণের কিষ্কিন্ধা কাণ্ডে যখন অঙ্গদ, হনুমান ও জাম্ববান সীতার খোঁজে দক্ষিণ দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন তাঁরা সমুদ্রতীরে হতাশ হয়ে বসে পড়েন। তাঁরা যখন জটায়ুর বীরত্ব ও মৃত্যুর কথা আলোচনা করছিলেন, তখন পাহাড়ের গুহা থেকে এক বিশাল পক্ষী দেহ টেনে টেনে বেরিয়ে আসেন। তিনি ছিলেন ডানাভাঙ্গা সম্পাতি। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি অত্যন্ত শোকাতুর হন এবং রামের দূতদের নিজের পরিচয় দেন।
দূরদৃষ্টি ও লঙ্কার হদিশ
{{/usCountry}}ডানা না থাকলেও সম্পাতির দিব্য দৃষ্টি ছিল অটুট। তিনি পর্বত শিখরে বসে সমুদ্রের ওপারে ১০০ যোজন দূরে লঙ্কা দ্বীপে বন্দি সীতাকে দেখতে পান। তিনিই প্রথম হনুমানদের নিশ্চিত করেন যে, সীতা রাবণের অশোক বনে জীবিত আছেন। সম্পাতি বলেছিলেন, "আমি আমার এই দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, রাবণ সীতাকে নিয়ে লঙ্কায় অবস্থান করছে। তোমরা সমুদ্র লঙ্ঘন করলেই তাঁর দেখা পাবে।" সম্পাতির এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই হনুমান সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সাহস সঞ্চয় করেন।
ডানা ফিরে পাওয়া ও মুক্তি
কথিত আছে, মহর্ষি নিশাকর সম্পাতিকে অভিশাপমুক্ত হওয়ার পথ বলে দিয়েছিলেন। ঋষি বলেছিলেন, যেদিন তিনি শ্রীরামের দূতদের সীতার খবর দিয়ে সাহায্য করবেন, সেদিনই তাঁর নতুন ডানা গজাবে। যেই মুহূর্তে সম্পাতি হনুমানদের সীতার সংবাদ দিলেন, অমনি অলৌকিকভাবে তাঁর দগ্ধ ডানা দুটি পুনরায় গজিয়ে ওঠে। তিনি ফিরে পান তাঁর পুরনো তেজ এবং আকাশপথে উড়ে গিয়ে শ্রীরামের জয়গান করেন।
সম্পাতি চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে, শারীরিক অক্ষমতা থাকলেও মনের সাহস ও পরোপকারের ইচ্ছা থাকলে বড় লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব। তিনি নিজের ডানা হারিয়ে জটায়ুকে বাঁচিয়ে ভ্রাতৃপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং বৃদ্ধ বয়সে রামের কার্যে সহায়তা করে ধর্মের পথে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। সম্পাতি না থাকলে হয়তো হনুমানের লঙ্কা বিজয় আরও কঠিন হয়ে পড়ত।