রামায়ণের বিশাল মহাকাব্যে আমরা রাবণ, বিভীষণ বা কুম্ভকর্ণের কথা বিস্তারিত জানলেও, লঙ্কার সেই অন্ধকার দিনগুলোতে এক পরম মমতাময়ী নারী চরিত্রের কথা আড়ালে রয়ে গেছে। তিনি হলেন ত্রিজটা। রাক্ষসরাজ রাবণের ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং বিভীষণের কন্যা হয়েও ত্রিজটা ছিলেন ধর্মপরায়ণা এবং দেবী সীতার পরম হিতৈষী। লঙ্কার অশোক কাননে বন্দিনী সীতার যখন কেউ ছিল না, তখন ত্রিজটাই তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন।

ত্রিজটার সেই মহিমাময় কাহিনি এবং রামায়ণে তাঁর ভূমিকা অনেকেই জানেন না।
বাল্মীকি রামায়ণ এবং তুলসীদাসের রামচরিতমানস—উভয় গ্রন্থেই ত্রিজটার উল্লেখ পাওয়া যায়। যখন রাবণ সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় এনে অশোক কাননে বন্দি করে রাখেন, তখন তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য অনেক রাক্ষসীকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। রাবণের আদেশ ছিল সীতাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলা। কিন্তু সেই রাক্ষসীদের দলেই ছিলেন ত্রিজটা, যিনি রাক্ষস কুলে জন্মেও হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন মানবিকতা ও দেবভক্তি।
সীতার রক্ষাকর্ত্রী ও সান্ত্বনাদাত্রী
অশোক কাননে সীতা যখন রাবণের হুমকির মুখে পড়ে আত্মহত্যার কথা ভাবতেন, তখন ত্রিজটাই তাঁকে সাহস জোগাতেন। অন্য রাক্ষসীরা যখন সীতাকে ভয় দেখাত, তখন ত্রিজটা তাদের থামাতেন এবং সীতাকে পরম যত্নে আগলে রাখতেন। তিনি সীতাকে মা বলে সম্বোধন করতেন এবং আশ্বস্ত করতেন যে শ্রীরামচন্দ্র অবশ্যই তাঁকে উদ্ধার করতে আসবেন।
ত্রিজটার সেই বিখ্যাত স্বপ্ন
রামায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো 'ত্রিজটার স্বপ্ন'। লঙ্কাকাণ্ড শুরুর আগে ত্রিজটা এক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেন এবং তা অন্য রাক্ষসীদের বলেন। তিনি দেখেছিলেন:
{{/usCountry}}রামায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো 'ত্রিজটার স্বপ্ন'। লঙ্কাকাণ্ড শুরুর আগে ত্রিজটা এক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেন এবং তা অন্য রাক্ষসীদের বলেন। তিনি দেখেছিলেন:
{{/usCountry}}শ্রীরামচন্দ্র একটি সাদা হাতির পিঠে চড়ে লঙ্কায় আসছেন।
রাবণ তৈলাক্ত শরীরে গাধার পিঠে চড়ে দক্ষিণ দিকে (মৃত্যুর দিক) যাচ্ছেন।
লঙ্কাপুরী আগুনে ভস্মীভূত হচ্ছে এবং বিভীষণ শ্রীরামের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
এই স্বপ্ন দেখার পর ত্রিজটা রাক্ষসীদের সতর্ক করে বলেন যে, সীতাকে কষ্ট দেওয়া বন্ধ করতে, কারণ লঙ্কার বিনাশ আসন্ন। তাঁর এই ভবিষ্যৎবাণী সীতাকে নতুন করে বাঁচার আশা দিয়েছিল।
বিভীষণের কন্যা হিসেবে তাঁর ভূমিকা
ত্রিজটা ছিলেন লঙ্কার ধার্মিক রাক্ষস বিভীষণের কন্যা। পিতার আদর্শেই তিনি অনুপ্রাণিত ছিলেন। হনুমান যখন লঙ্কায় সীতার খোঁজে আসেন, তখন ত্রিজটাই তাঁকে সীতার অবস্থান বুঝতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন। এমনকি যুদ্ধের সময় যখন ইন্দ্রজিতের মায়াবলে রাম ও লক্ষণ নাগপাশে বন্দি হন, তখন সীতাকে শোকাতুর দেখে ত্রিজটাই তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে প্রভু রাম জীবিত আছেন।
রামায়ণের শেষে ত্রিজটার স্থান
লঙ্কা বিজয়ের পর যখন সীতা অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে শুদ্ধ হয়ে রামের পাশে বসেন, তখন তিনি ত্রিজটার কথা ভুলে যাননি। সীতা শ্রীরামের কাছে অনুরোধ করেছিলেন যেন ত্রিজটাকে সসম্মানে পুরস্কৃত করা হয়। ত্রিজটার এই নিঃস্বার্থ সেবা প্রমাণ করে যে, বংশ বা জাতি দিয়ে নয়, বরং মানুষের পরিচয় হয় তাঁর কর্ম ও সহমর্মিতা দিয়ে। রাক্ষস বংশে জন্মেও তিনি আজ ভক্ত হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধেয় এক চরিত্র।