তাঁকে বলা হয় রাজরাজেশ্বরী! অনায়াসেই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করেন তিনি, জানুন দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরীর কথা
দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী হলেন সদাশিবের শক্তি। তিনি চার হাত বিশিষ্ট এবং রক্তবর্ণা। তাঁর হাতে রয়েছে ইক্ষু ধনু (আখের ধনুক), পাঁচটি পুষ্পবাণ, পাশ (শিকল) এবং অঙ্কুশ।
শ্রীবিদ্যা বা শক্তিবাদ (Shaktism) অনুসারে, দশমহাবিদ্যার অন্যতম এবং পরমেশ্বরী রূপ হলেন দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী। তাঁকে 'রাজরাজেশ্বরী' বা 'কামাক্ষী' নামেও ডাকা হয়। ললিতা কথার অর্থ হলো 'যিনি অনায়াসেই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করেন' অথবা 'যিনি সুন্দরী ও লাবণ্যময়ী'। তিনি ব্রহ্মাণ্ডের চূড়ান্ত শক্তি এবং আদি পরাশক্তির পূর্ণ বিকশিত রূপ।

ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর স্বরূপ, তাঁর পৌরাণিক আখ্যান এবং জ্যোতিষতাত্ত্বিক গুরুত্ব জেনে নিন।
ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী: আদি পরাশক্তির রাজকীয় রূপ
শাস্ত্রমতে, দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী হলেন সদাশিবের শক্তি। তিনি চার হাত বিশিষ্ট এবং রক্তবর্ণা। তাঁর হাতে রয়েছে ইক্ষু ধনু (আখের ধনুক), পাঁচটি পুষ্পবাণ, পাশ (শিকল) এবং অঙ্কুশ। তাঁর রূপ কেবল শারীরিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং তা ব্রহ্মজ্ঞানের পরম চেতনার বহিঃপ্রকাশ। তিনি 'শ্রীচক্র' বা শ্রীযন্ত্রের অধিশ্বরী।
দেবীর পৌরাণিক কাহিনি: ভণ্ডাসুর বধ
'ললিতা মাহাত্ম্য' অনুসারে, যখন কামদেবকে মহাদেব ভস্মীভূত করেছিলেন, সেই ভস্ম থেকে 'ভণ্ডাসুর' নামক এক শক্তিশালী অসুরের জন্ম হয়। ভণ্ডাসুর কঠোর তপস্যার মাধ্যমে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর লাভ করে এবং দেবলোক আক্রমণ করে দেবতাদের শক্তিহীন করে দেয়। তখন দেবতারা আদি পরাশক্তির আরাধনা করেন।
দেবতাদের আহ্বানে এক প্রকাণ্ড হোমকুণ্ড বা 'মহাযাগ' থেকে ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী আবির্ভূত হন। তিনি রাজরাজেশ্বরী রূপে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়ে ভণ্ডাসুরকে বধ করেন এবং সৃষ্টিতে পুনরায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনেন। এই কাহিনীটি মূলত আমাদের মনের কাম, ক্রোধ ও মোহ রূপী ভণ্ডাসুরকে বিনাশ করে আধ্যাত্মিক জয়ের প্রতীক।
কারা তাঁর পুজো করতে পারেন?
ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরীর পুজো অত্যন্ত রহস্যময় এবং ফলদায়ক। শাস্ত্রমতে:
- গৃহস্থ ও সাধক: শ্রীবিদ্যা সাধনা গৃহস্থ ও সন্ন্যাসী উভয়ই করতে পারেন। তবে এই দেবীর সাধনা অত্যন্ত সূক্ষ্ম, তাই সাধারণত কোনো উপযুক্ত গুরুর নির্দেশনায় পুজো বা জপ করা শ্রেয়।
- নারীর ক্ষমতায়ন: যারা নারী শক্তির জাগরণ বা সাংসারিক শান্তি ও ঐশ্বর্য চান, তারা দেবীর ললিতা সহস্রনাম পাঠ করতে পারেন।
- কঠিন বাধা দূর করতে: যাদের জীবনে দীর্ঘদিনের আর্থিক কষ্ট বা শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, তারা দেবীর শরণাপন্ন হতে পারেন।
জ্যোতিষশাস্ত্র ও শক্তিবাদ কী বলছে?
১. জ্যোতিষতাত্ত্বিক গুরুত্ব
জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী হলেন শুক্র (Venus) এবং বুধ (Mercury) গ্রহের নিয়ন্ত্রক।
- শুক্রের প্রভাব: যাদের জন্মকুণ্ডলীতে শুক্র দুর্বল বা নিচস্থ, তারা দেবীর আরাধনা করলে প্রেম, বিলাসিতা এবং দাম্পত্য সুখ লাভ করেন।
- বুদ্ধি ও বাকশক্তি: বুধের অশুভ দশা কাটাতে এবং শিক্ষার্থীদের বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে দেবীর 'ত্রিপুরসুন্দরী মন্ত্র' জপ করা অত্যন্ত কার্যকরী।
- পূর্ণিমা তিথি: প্রতি পূর্ণিমায় শ্রীচক্র বা ললিতা দেবীর পুজো করলে নবগ্রহের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
২. শক্তিবাদের দৃষ্টিভঙ্গি
শক্তিবাদে তাঁকে 'কামকলা' বা পরম সৃজনশীলতার আধার বলা হয়। শ্রীবিদ্যার মতে, তিনি সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। সাধক যখন তাঁর আরাধনা করেন, তখন তিনি কেবল পার্থিব সুখ নয়, বরং 'মোক্ষ' বা মুক্তি লাভ করেন। তাঁর মন্ত্র 'শ্রীবিদ্যা' বা 'পঞ্চদশী মন্ত্র' জপ করলে কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়।
ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী কেবল করুণাময়ী মাতা নন, তিনি আমাদের মনের অশুভ শক্তির বিনাশক। তাঁর আরাধনা আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা মানে জাগতিক ত্যাগ নয়, বরং জগতে থেকেও পূর্ণ ঐশ্বর্য ও আনন্দের সাথে ঈশ্বরকে লাভ করা। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন মানুষের জীবনে মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে, তখন ললিতা দেবীর ধ্যান ও সহস্রনাম পাঠ মনের প্রশান্তির শ্রেষ্ঠ পথ।
E-Paper











