Why Ambubachi is celebrated: প্রতি বছর আষাঢ় মাসের মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পাদ শেষ হলে শুরু হয় সনাতন ধর্মের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিক উৎসব—‘অম্বুবাচী’ (Ambubachi)। বিশেষ করে ভারতের আসামের গুয়াহাটিতে অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কামাখ্যা মন্দিরে (Kamakhya Temple) এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এক বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়, যা ‘অম্বুবাচী মেলা’ নামে খ্যাত। আজ ২০২৬ সালের এই পবিত্র সময়েও কোটি কোটি ভক্ত ও সাধক দেবীর এই বিশেষ রূপের আরাধনায় মগ্ন।

কিন্তু কেন পালন করা হয় এই অম্বুবাচী? এর পেছনের লোকবিশ্বাস, ইতিহাস এবং হিন্দু পুরাণই বা কী বলে? মাতৃশক্তি ও ধরিত্রী মাতার এই অনন্য উৎসবের সম্পর্কে জেনে নিন।
‘অম্বুবাচী’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘জল বা মেঘের বাণী’। লোকবিশ্বাস এবং জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, এই সময়ে সূর্য মিথুন রাশিতে প্রবেশ করে এবং বর্ষাকালের সূচনা হয়। বর্ষার নতুন জলে পৃথিবী বা ধরিত্রী মাতা সিক্ত হন। সনাতন ধর্মে পৃথিবীকে নারী তথা ‘মাতৃরূপ’ হিসেবে পুজো করা হয়। তাই বিশ্বাস করা হয়, আষাঢ়ের এই বিশেষ ৩ দিন ধরিত্রী মাতা রজঃস্বলা বা ঋতুমতী হন। নারীদের মতো পৃথিবীর এই উর্বরতা শক্তি উদযাপনের উৎসবই হলো অম্বুবাচী।
পুরাণে কী বলছে? সতীপীঠ ও কামাখ্যার আদি ইতিহাস
অম্বুবাচীর মূল ভিত্তি লুকিয়ে রয়েছে দেবী ভাগবত পুরাণ, কালিকা পুরাণ এবং শিব পুরাণের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উপাখ্যানের মধ্যে।
পুরাণ অনুযায়ী, প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞে স্বামী মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে দেবী সতী দেহত্যাগ করেছিলেন। সতীর মৃত্যুর পর গভীর শোকে ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে শিব তাঁর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে ‘তাণ্ডব’ নৃত্য শুরু করেন। মহাবিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবী সতীর দেহকে ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করে দেন। সতীর দেহের সেই অংশগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের যে যে স্থানে পড়েছিল, তা-ই আজ ‘সতীপীঠ’ নামে পুজিত হয়।
{{/usCountry}}পুরাণ অনুযায়ী, প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞে স্বামী মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে দেবী সতী দেহত্যাগ করেছিলেন। সতীর মৃত্যুর পর গভীর শোকে ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে শিব তাঁর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে ‘তাণ্ডব’ নৃত্য শুরু করেন। মহাবিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে দেবী সতীর দেহকে ৫১টি খণ্ডে বিভক্ত করে দেন। সতীর দেহের সেই অংশগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের যে যে স্থানে পড়েছিল, তা-ই আজ ‘সতীপীঠ’ নামে পুজিত হয়।
{{/usCountry}}দেবী সতীর ‘যোনি’ বা গর্ভ অংশটি পড়েছিল আসামের নীলাচল পর্বতে, যা আজকের বিখ্যাত কামাখ্যা মন্দির। যেহেতু এই পীঠে দেবীর সৃষ্টির মূল আধার বা যোনি অংশ পুজিত হয়, তাই কামাখ্যাকে সমস্ত সতীপীঠের মহাপীঠ বলা হয়। পুরাণের এই গর্ভ বা সৃষ্টির ধারণার ওপর ভিত্তি করেই অম্বুবাচীর সময় কামাখ্যা দেবীর বার্ষিক ঋতুচক্রের উৎসব পালন করা হয়।
৩ দিনের কঠোর নিয়ম ও আচার
অম্বুবাচীর প্রবৃত্তি (শুরু) থেকে নিবৃত্তি (শেষ) পর্যন্ত টানা ৩ দিন কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলা হয়:
১. মন্দিরের দরজা বন্ধ: অম্বুবাচীর ৩ দিন কামাখ্যা দেবীর গর্ভগৃহের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। মনে করা হয়, এই সময় দেবী বিশ্রামে থাকেন। কোনো ভক্ত বা পুরোহিতও এই ৩ দিন মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেন না।
২. কৃষিকাজ ও খনন নিষিদ্ধ: যেহেতু ধরিত্রী মাতাকে ঋতুমতী মনে করা হয়, তাই এই ৩ দিন জমিতে হাল চাষ করা, কোদাল চালানো, নতুন গাছ রোপণ করা বা মাটি খনন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। পৃথিবীকে কোনো রকম আঘাত না দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
৩. গৃহকোণে পুজো ও সংযম: সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা এই ৩ দিন বাড়িতে কোনো মূর্তি পুজো বা নিত্যপুজো করেন না। দেবদেবীর মূর্তি কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়। এছাড়া এই সময়ে বিধবা মহিলারা, সাধু এবং তান্ত্রিকরা রাঁধা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকেন এবং ফলমূল আহার করে ‘সংযম’ পালন করেন।
চতুর্থ দিনের অলৌকিক সমাপন ও ‘রক্তবস্ত্র’
৩ দিন পর চতুর্থ দিনে মন্দিরের দরজা খোলা হয়। দেবীকে স্নান করিয়ে বিশেষ পুজো ও ভোগ নিবেদন করা হয়। এরপরই শুরু হয় দেবী দর্শনের মহোৎসব। অম্বুবাচীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দেবীর প্রসাদী ‘অঙ্গবস্ত্র’ বা রক্তবস্ত্র।
৩ দিন ধরে দেবীর আসনের নিচে যে সাদা কাপড়টি বিছিয়ে রাখা হয়, অলৌকিকভাবে তা লাল রঙে রঞ্জিত হয়ে যায়। এই লাল কাপড়ের টুকরো বা রক্তবস্ত্র পাওয়ার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও তান্ত্রিক কামাখ্যা ধামে ভিড় জমান। মনে করা হয়, এই বস্ত্র ধারণ করলে সমস্ত আপদ-বিপদ দূর হয়।
আজকের ২০২৬ সালের আধুনিক বিজ্ঞান ও সভ্যতার যুগেও অম্বুবাচী উৎসব আমাদের এক গভীর বার্তা দেয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং প্রকৃতির উর্বরতা শক্তি এবং নারীত্বের প্রতি পরম শ্রদ্ধার এক ঐতিহাসিক উৎসব। পৃথিবীকে মা হিসেবে সম্মান জানানোর এই সনাতন ঐতিহ্য সত্যিই অনন্য এবং পরিবেশবান্ধব।