মহাদেবের আর এক নাম কেন পিণাকপানি? এর পিছনে রয়েছে রামায়ণের কোন ঘটনা? মহাশিবরাত্রির আগে জেনে নিন

বিশ্বকর্মা দুটি দিব্য ও অপরাজেয় ধনুক নির্মাণ করেছিলেন। একটির নাম ছিল 'শার্ঙ্গ' এবং অন্যটির নাম 'পিণাক'। শার্ঙ্গ ধনুকটি ভগবান বিষ্ণুকে প্রদান করা হয় এবং পিণাক ধনুকটি লাভ করেন ভগবান শিব। এর পরে কী হল?

Published on: Feb 15, 2026, 12:25:51 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

দেবদাদিদেব মহাদেব অনন্ত গুণের অধিকারী। তাঁর সহস্র নামের প্রতিটি নামের পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো গভীর তত্ত্ব বা রোমাঞ্চকর পৌরাণিক আখ্যান। শিবের এমনই একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ নাম হলো 'পিণাকপাণি' (Pinakapani)। কেন মহাদেবকে এই নামে ডাকা হয়? কী এই 'পিণাক'? এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মহাজাগতিক যুদ্ধের কাহিনি জেনে নিন।

মহাদেবের আর এক নাম কেন পিণাকপানি? এর পিছনে রয়েছে রামায়ণের কোন ঘটনা
মহাদেবের আর এক নাম কেন পিণাকপানি? এর পিছনে রয়েছে রামায়ণের কোন ঘটনা

'পিণাকপাণি' শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ

'পিণাকপাণি' শব্দটি দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত— 'পিণাক' এবং 'পাণি'।

  • পিণাক: এটি হলো ভগবান শিবের মহাশক্তিশালী ধনুকের নাম।
  • পাণি: সংস্কৃত ভাষায় পাণি শব্দের অর্থ হলো 'হাত'।

অর্থাৎ, যাঁর হাতে (পাণিতে) 'পিণাক' নামক ধনুকটি শোভা পায়, তিনিই হলেন পিণাকপাণি। ঠিক যেমন বিষ্ণুর হাতে শার্ঙ্গ ধনুক থাকে বলে তিনি 'শার্ঙ্গপাণি', তেমনি শিবের এই বিশেষ রূপটিই হলো পিণাকপাণি।

পিণাক ধনুকের উৎপত্তির কাহিনি

পৌরাণিক মতে, বিশ্বকর্মা দুটি দিব্য ও অপরাজেয় ধনুক নির্মাণ করেছিলেন। একটির নাম ছিল 'শার্ঙ্গ' এবং অন্যটির নাম 'পিণাক'। শার্ঙ্গ ধনুকটি ভগবান বিষ্ণুকে প্রদান করা হয় এবং পিণাক ধনুকটি লাভ করেন ভগবান শিব। এই পিণাক ধনুকটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, এর টঙ্কারে ব্রহ্মাণ্ড কম্পিত হতো এবং এর থেকে নিক্ষিপ্ত বাণ লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া অসম্ভব ছিল।

কেন শিব পিণাকপাণি? ত্রিপুরান্তক কাহিনি

শিবের হাতে পিণাক ধনুক উঠে আসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি হলো ত্রিপুরাসুর বধ।

তারকাসুরের তিন পুত্র— তারকাক্ষ, কমলাক্ষ ও বিদ্যুন্মালী ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করে তিনটি অপার্থিব নগর বা 'ত্রিপুরা' লাভ করেছিল। একটি স্বর্ণের (স্বর্গে), একটি রৌপ্যের (অন্তরিক্ষে) এবং একটি লৌহের (মর্ত্যে)। তাদের শর্ত ছিল, হাজার বছর অন্তর যখন এই তিনটি নগর এক সরলরেখায় আসবে, কেবল তখনই একটিমাত্র বাণের আঘাতেই তাদের ধ্বংস করা সম্ভব হবে।

অসুরের অত্যাচারে যখন দেবতারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন, তখন মহাদেব এই বধের দায়িত্ব নিলেন। এই যুদ্ধের জন্য এক বিশাল রথ তৈরি হলো— পৃথিবী হলো রথ, সূর্য ও চন্দ্র চাকা, ব্রহ্মা সারথি এবং স্বয়ং সুমেরু পর্বত হলো ধনু বা ধনুক। কিন্তু মূল অস্ত্র হিসেবে মহাদেব তাঁর নিজস্ব 'পিণাক' ধনুকটি ধারণ করলেন। যখন তিনটি নগর এক সরলরেখায় এলো, মহাদেব পিণাক ধনুকে জ্যা আরোপ করে 'পাশুপত' বাণ নিক্ষেপ করলেন। নিমেষের মধ্যে তিনটি নগর ভস্মীভূত হলো এবং শিব 'ত্রিপুরান্তক' হিসেবে পরিচিত হলেন। হাতে পিণাক ধনুক নিয়ে দণ্ডায়মান সেই রুদ্র রূপটিই হলো 'পিণাকপাণি'।

রামায়ণের সাথে পিণাকের সংযোগ

ত্রেতা যুগে রাজা জনকের প্রাসাদে রক্ষিত সেই বিখ্যাত 'শিবধনু' আসলে ছিল এই পিণাক। কাহিনী অনুসারে, দক্ষ যজ্ঞ বিনাশের পর ক্রুদ্ধ শিব এই ধনুকটি দেবতাদের দিয়েছিলেন। দেবতাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এটি মিথিলার রাজবংশের কাছে আসে। সীতার স্বয়ম্বর সভায় শ্রীরামচন্দ্র এই পিণাক ধনুকটিতেই জ্যা আরোপ করতে গিয়ে সেটি ভেঙে ফেলেন। ধনুকটি ভেঙে যাওয়ার অর্থ ছিল মহাদেবের এক বিশেষ লীলার সমাপ্তি এবং রামের অবতারে বিষ্ণুর শক্তির প্রকাশ।

ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

জ্যোতিষশাস্ত্রে ভগবান শিবকে সমস্ত গ্রহের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে যাঁদের কোষ্ঠীতে মঙ্গল (Mars) বা শনি (Saturn) গ্রহের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, তাঁদের জন্য 'পিণাকপাণি' রূপের ধ্যান অত্যন্ত ফলদায়ক।

  • সুরক্ষা: পিণাক ধনুক হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ভক্তের সুরক্ষার প্রতীক।
  • একাগ্রতা: ধনুক যেমন লক্ষ্যের প্রতীক, তেমনি পিণাকপাণি রূপটি সাধককে আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে।
  • বিজয়: তান্ত্রিক সাধনায় শত্রুজয় এবং জীবনের বাধা দূর করতে পিণাকপাণি মন্ত্র জপ করার বিধান রয়েছে।

পিণাকপাণি কেবল মহাদেবের একটি নাম নয়, এটি ধর্মের রক্ষাকর্তার পরিচয়। হাতে ধনু ধারণ করে তিনি আমাদের এই শিক্ষাই দেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে ধরাও পরম ধর্ম। আজকের এই অশান্ত পৃথিবীতে শিবের 'পিণাকপাণি' রূপ আমাদের নির্ভীকতা এবং ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা দেয়।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More