সনাতন হিন্দু ধর্মে সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা ও আনন্দের প্রতীক। গণেশ চতুর্থী থেকে শুরু করে যেকোনো গণেশ পুজোয় বাপ্পার নৈবেদ্য হিসেবে যে মিষ্টিটির নাম সর্বাগ্রে আসে, তা হলো 'মোদক' (Modak)। বলা হয়ে থাকে, নানা রকমের সুস্বাদু পদ নিবেদন করা হলেও মোদক ছাড়া গণপতির পুজো ও ভোগ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ কারণে শ্রী গণেশের অপর এক নাম হলো 'মোদকপ্রিয়' (Modakapriya)।

তবে কেন এই বিশেষ চালের গুঁড়ো, নারকেল ও গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টিটি বিঘ্নহর্তার এত প্রিয়? এই মিষ্টি প্রসাদের পেছনে কী পৌরাণিক কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে? আর মোদকের শারীরিক গঠনের পেছনেই বা কী আধ্যাত্মিক বার্তা রয়েছে?— জেনে নিন।
পৌরাণিক কাহিনি: অশ্বিনী কুমার ও অনসূয়ার অলৌকিক মোদক
পৌরাণিক শাস্ত্রে গণপতির মোদকপ্রিয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অলৌকিক কাহিনী বর্ণিত রয়েছে:
মহর্ষি অত্রি ও দেবী অনসূয়ার গল্প: একদা মহাদেব শিব, দেবী পার্বতী এবং বালক গণেশ মহর্ষি অত্রি ও দেবী অনসূয়ার আশ্রমে আগমন করেন। দেবী অনসূয়া তাঁদের পরম আনন্দে ভোজন করানোর ব্যবস্থা করেন। বালক গণেশের ক্ষুধা ছিল অসীম। শিব-পার্বতী ভোজন শেষ করলেও বালক গণেশের ক্ষুধা মিটছিল না; তিনি একের পর এক পদ খেয়েই যাচ্ছিলেন। আশ্রমের সমস্ত খাবার প্রায় শেষ হতে চললে দেবী অনসূয়া এক বিশেষ মিষ্টি তৈরি করে বালক গণেশের মুখে তুলে দেন।
সেই মিষ্টিটি মুখে দেওয়া মাত্রই পরম তৃপ্তিতে বালক গণেশ এক বিরাট ঢেঁকুর তোলেন এবং তাঁর পেট ভরে যায়। একই সাথে কৈলাশপতি মহাদেবও ২১ বার ঢেঁকুর তোলেন, যা নির্দেশ করে যে দুজনেরই ক্ষুধা সম্পূর্ণ নিবৃত্ত হয়েছে। পরম আনন্দের এই মিষ্টিটিই ছিল 'মোদক'। এতে দেবী পার্বতী অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বর দেন যে, আজ থেকে গণপতিকে সন্তুষ্ট করতে হলে ভক্তদের সর্বাগ্রে এই মোদকই নিবেদন করতে হবে।
{{/usCountry}}সেই মিষ্টিটি মুখে দেওয়া মাত্রই পরম তৃপ্তিতে বালক গণেশ এক বিরাট ঢেঁকুর তোলেন এবং তাঁর পেট ভরে যায়। একই সাথে কৈলাশপতি মহাদেবও ২১ বার ঢেঁকুর তোলেন, যা নির্দেশ করে যে দুজনেরই ক্ষুধা সম্পূর্ণ নিবৃত্ত হয়েছে। পরম আনন্দের এই মিষ্টিটিই ছিল 'মোদক'। এতে দেবী পার্বতী অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বর দেন যে, আজ থেকে গণপতিকে সন্তুষ্ট করতে হলে ভক্তদের সর্বাগ্রে এই মোদকই নিবেদন করতে হবে।
{{/usCountry}}দেবী পার্বতীর অলৌকিক মোদক ও দুই ভাইয়ের পরীক্ষা: অপর এক পৌরাণিক উপাখ্যান অনুযায়ী, দেবগণ একবার দেবী পার্বতীকে একটি পরম জ্ঞানপ্রদ ও অমৃততুল্য মোদক উপহার দেন। এই মিষ্টিটি খেলে ব্যক্তি সর্ববিদ্যা ও অমরত্ব লাভ করবে। দেবী পার্বতী তাঁর দুই পুত্র গণেশ ও কার্তিক দুজনকেই তা দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মোদকটি ভাগ করা সম্ভব ছিল না।
তখন দেবী পার্বতী দুই ভাইয়ের প্রজ্ঞা ও ভক্তির পরীক্ষা নেওয়ার জন্য মহাবিশ্ব পরিক্রমার প্রতিযোগিতা রাখেন। কার্তিক বাহনে চেপে বিশ্ব ভ্রমণে বের হলেও গণপতি প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে মাতা-পিতাকে প্রদক্ষিণ করে বিজয়ী হন। দেবী পার্বতী পরম স্নেহে সেই জ্ঞান রূপী মোদকটি গণেশের হাতে তুলে দেন। সেই থেকে মোদক গণপতির পরম প্রিয় আহার।
মোদক শব্দের অর্থ ও এর আধ্যাত্মিক প্রতীকী গুরুত্ব
'মোদক' শব্দটি কেবল একটি সুস্বাদু মিষ্টি নয়, সনাতন দর্শনে এর এক গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে:
'মোদ' অর্থাৎ পরম আনন্দ: সংস্কৃত ভাষা অনুযায়ী 'মোদ' (Moda) শব্দের অর্থ হলো 'আনন্দ' বা 'সুখ', এবং 'ক' (Ka) নির্দেশ করে 'প্রদানকারী'। অর্থাৎ যা পরম আনন্দ প্রদান করে, তা-ই মোদক। শ্রী গণেশ যেহেতু ভক্তদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে আনন্দ প্রদান করেন, তাই মোদক হলো সেই পরমানন্দের প্রতীক।
মোদকের শারীরিক গঠন ও জ্ঞানের রূপক: মোদকের বাইরের অংশটি চালের আটা বা ময়দা দিয়ে তৈরি একটি মোচাকার বা ড্রপ-শেপ থলির মতো হয়, যা দেখতে কিছুটা বন্ধ কুঁড়ির মতো। আর এর ভেতরে থাকে নারকেল, গুড় ও এলাচের তৈরি মিষ্টি ও সুস্বাদু পুর।
বাইরের শক্ত অংশ: এটি আমাদের স্থূল শরীর, বাহ্যিক কঠিন জীবন ও দুঃখ-কষ্টের প্রতীক।
ভেতরের মিষ্টি পুর: এটি মানুষের আত্মা, সুপ্ত জ্ঞান এবং আত্মিক আনন্দের রূপক।
অর্থাৎ মোদক আমাদের শেখায় যে জীবনের কঠিন আবরণ বা দুঃখ-কষ্ট ভেদ করতে পারলে তবেই ভেতরে থাকা পরম জ্ঞান ও আত্মিক আনন্দের সাধ আস্বাদন করা সম্ভব।
গণেশ পুজোয় ২১টি মোদক নিবেদনের গুরুত্ব
শাস্ত্র অনুযায়ী, গণেশ চতুর্থী বা সংকাষ্ঠী চতুর্থীর পুজোয় বাপ্পাকে ২১টি মোদক নিবেদন করা পরম শুভ বলে মানা হয়:
- পঞ্চ মহাভূত ও ইন্দ্রিয় শান্ত করা: বৈদিক মতে, ২১ সংখ্যাটি হলো ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি প্রাণ, ৫টি মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) এবং ১টি মন—এই মোট ২১টি উপাদানের রূপক। ২১টি মোদক নিবেদনের মাধ্যমে ভক্তের সর্ব সত্তা বিঘ্নহর্তার চরণে উৎসর্গিত হয়।
- ক্ষুধা ও মানসিক শান্তি: বিশ্বাস করা হয়, গণপতিকে মোদক নিবেদন করলে সংসারে ধন-ধান্যের অভাব হয় না এবং মানসিক শান্তি বিরাজ করে।
মোদক কেবল গণপতি বাপ্পার প্রিয় প্রসাদই নয়, এটি প্রজ্ঞা, ভক্তি এবং দুঃখ পেরিয়ে পরম আনন্দ লাভের এক সুমহান প্রতীক। গণেশ পুজোয় ভক্তিভরে মোদক অর্পণ করলে ভক্তের জীবনের সমস্ত বাধা দূর হয় এবং জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি উপচে পড়ে।