পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক পরিষেবা আমজনতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ সরাসরি শোনার লক্ষ্যে এক নয়া ও যুগান্তকারী নির্দেশিকা জারি করেছে নবান্ন। এ বার থেকে ব্লকের বিডিও (BDO) থেকে শুরু করে মহকুমা শাসক (SDO), জেলা শাসক (DM) এবং মিউনিসিপ্যাল কমিশনার সহ প্রতিটি দপ্তরের ফিল্ড-লেভেলের শীর্ষ আধিকারিকদের প্রতি সপ্তাহে বাধ্যতামূলকভাবে দু'দিন করে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি বসতে হবে।

নবান্নের এই নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে ব্লক স্তর পর্যন্ত সরকারি অফিসারদের সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে মুখোমুখি 'জনতার দরবার' বা গণশুনানির আয়োজন করতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে প্রশাসনিক জটিলতা এড়িয়ে কোনো অগ্রিম অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা অনুমতি ছাড়াই নিজেদের অভাব-অভিযোগ এবং আবেদনের কথা আধিকারিকদের জানাতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই বন্দোবস্ত।
১. সপ্তাহের কোন দিনগুলোতে ও কতক্ষণ বসবে 'জনতার দরবার'?
নবান্ন সূত্রে জারি করা নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে সময়সূচী ও দিনক্ষণ:
- নির্দিষ্ট দিন ও সময়: প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার সকাল ১০:৩০ টা থেকে দুপুর ১:০০ টা পর্যন্ত আধিকারিকরা সরাসরি জনসাধারণের মুখোমুখি হবেন।
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই সাক্ষাৎ: এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যেকোনো সাধারণ নাগরিক কোনো পূর্ব অনুমতি বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই সরাসরি জেলা শাসক, মহকুমা শাসক, বিডিও কিংবা মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের টেবিলে গিয়ে সমস্যা জানাতে পারবেন।
- অন্যান্য কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ: নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত ওই আড়াই ঘণ্টার সময়ে আধিকারিকরা যেন কোনো প্রশাসনিক বৈঠক, মাঠ পরিদর্শনের অফিশিয়াল সফর কিংবা অন্যান্য কর্মসূচি যথাসম্ভব না রাখেন। ওই নির্দিষ্ট সময়টি পুরোপুরি আমজনতার কথা শোনার জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।
২. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক তদারকি
নবান্নের পক্ষ থেকে কেবল সামনাসামনি দেখাই শেষ কথা নয়, বরং নাগরিকদের সেই সব অভিযোগ সমাধানের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে:
{{/usCountry}}নবান্নের পক্ষ থেকে কেবল সামনাসামনি দেখাই শেষ কথা নয়, বরং নাগরিকদের সেই সব অভিযোগ সমাধানের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে:
{{/usCountry}}১. মোবাইল ও ইমেল নম্বর প্রকাশ: প্রশাসনিক দপ্তরের সামনে এবং অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ইমেল ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ অনায়াসে যোগাযোগ করতে পারেন।
২. অভিযোগ নিস্পত্তির ট্র্যাকিং ও রেকর্ড: সাধারণ মানুষের থেকে পাওয়া অভিযোগ কেবল শুনলেই চলবে না, সেই অভিযোগগুলোর ওপর কী কী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো (Action Taken), তার লিখিত রেকর্ড বা রেজিস্টার রাখতে হবে দপ্তরের কর্তাদের।
৩. অগ্রিম নোটিশ টাঙানো: দপ্তরের সামনে আগাম বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দিতে হবে সপ্তাহের কোন দিন ও কোন সময়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিক জনশুনানির জন্য উপবিষ্ট থাকবেন।
৩. কেন এত বড় সিদ্ধান্ত নবান্নের?
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলে রাজ্য সরকারের একাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু অনেক সময় স্থানীয় স্তরের জটিলতা বা আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁসে আটকে পড়ে সাধারণ মানুষের জরুরি আবেদন ও সরকারি পরিষেবার সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া।
নবান্ন থেকে জারি করা এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো অভিযোগ নিস্পত্তি প্রক্রিয়াকে (Grievance Redressal Mechanism) সর্বোচ্চ স্তরে স্বচ্ছ ও গতিশীল করে তোলা। মানুষ যাতে তাঁদের সমস্যা নিয়ে ওপরতলার মহলে দৌড়াদৌড়ি না করে স্থানীয় স্তরেই সমাধান পান, তা সুনিশ্চিত করতেই নবান্নের এই কড়া বার্তা।
সপ্তাহে দু'দিন করে মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার সকাল ১০:৩০টা থেকে ১টা পর্যন্ত সরকারি অফিসারদের 'জনতার দরবার'-এ উপস্থিত থাকার এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য এক বিরাট স্বস্তির খবর। প্রশাসনের এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষ ও সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে দূরত্ব অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।