...
...
Next Story

কলকাতার ‘সুগন্ধ’-এর শুরু এই দোকানেই, আসতেন রবীন্দ্রনাথ থেকে নেতাজি! রোজ এর সামনে দিয়ে গেলেও ইতিহাস জানেন না অনেকেই

১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সুগন্ধির দোকানটির বয়স ২০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আধুনিক বহুজাতিক সুগন্ধি ব্র্যান্ড আর স্প্রে ডিওডোরান্টের ভিড়ে আজও এই দোকানটি ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে স্বমহিমায় টিকে রয়েছে।

Published on: Aug 22, 2026, 08:37:18 IST
Advertisement

ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের শহর কলকাতা। উত্তর কলকাতার চিৎপুর, জাকারিয়া স্ট্রিট এবং মৌলানা শওকত আলী স্ট্রিটের মেঠো গলিতে আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক সুপ্রাচীন সুবাস—যা ভিক্টোরিয়ান কলকাতার আভিজাত্য ও নবাবী আমলের সুগন্ধির স্মৃতিকথা বহন করে চলেছে। এই সুবাসের মূল উৎস হলো ‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’ (Haji Khuda Bukhsh Nabi Bukhsh)—যা কলকাতার সর্বপ্রাচীন পারফিউম বা আতরের দোকান হিসেবে পরিচিত।

কলকাতার প্রথম পারফিউম-আতরের দোকান এটিই, আসতেন রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজিও!
কলকাতার প্রথম পারফিউম-আতরের দোকান এটিই, আসতেন রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজিও!

১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সুগন্ধির দোকানটির বয়স ২০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আধুনিক বহুজাতিক সুগন্ধি ব্র্যান্ড আর স্প্রে ডেওডোরান্টের ভিড়ে আজও এই দোকানটি ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে স্বমহিমায় টিকে রয়েছে। লখনউয়ের নবাবী সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর মতো মহান ব্যক্তিত্বদের পদাঙ্কধন্য এই ঐতিহাসিক পারফিউম শপের জন্ম ও বিকাশের রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. যেভাবে শুরু হয়েছিল এই সুগন্ধির দোকান: লখনউ থেকে কলকাতার যাত্রা

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (১৮০০ সাল নাগাদ) লখনউতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অযোধ্যার নবাবদের ক্ষমতা হারানো এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই সময় লখনউয়ের প্রখ্যাত সুগন্ধি কারিগর শেখ জান মুহাম্মদ নিজের পরিবার নিয়ে লখনউ ছেড়ে তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় চলে আসেন।

কলকাতার সমৃদ্ধশালী জমিদার, রাজা এবং বনেদি বাবু সম্প্রদায় আগে থেকেই লখনউয়ের তৈরি সুগন্ধি বা আতরের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। তাই বাংলার আভিজাত্যের চাহিদাকে সম্মান জানিয়ে শেখ জান মুহাম্মদ প্রথমে বেলেঘাটায় বসবাস শুরু করেন এবং শিয়ালদহ এলাকায় সুগন্ধি তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। এরপর ১৮২৪ সালে উত্তর কলকাতার মৌলানা শওকত আলী স্ট্রিটে (কলুটোলা/বড়বাজারের কাছে) তিনি ও তাঁর দুই সন্তান হাজী খোদা বক্স এবং হাজী নবী বক্স একটি স্থায়ী দোকান চালু করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় কলকাতার প্রথম এবং প্রাচীনতম সুগন্ধির প্রতিষ্ঠান—‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’।

২. রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি ও নেহেরু: ইতিহাসের দিকপাল গ্রাহকেরা

আজকের দিনের বেশিরভাগ বাণিজ্যিক পারফিউমে অ্যালকোহল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করা হলেও, ‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’-এ আজও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী ‘ডেগ-ভাপকা’ (Deg-Bhapka) স্টিম ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে সুগন্ধি তৈরি করা হয়। উত্তর প্রদেশের কনৌজ ও কলকাতায় নিজেদের কারখানায় ফুল, কাঠ ও মশলার রস নিষ্কাশন করে চন্দন কাঠের তেলের (Sandalwood oil) সাথে মিশিয়ে মাসব্যাপী প্রক্রিয়াজাত করে এই সুগন্ধি তৈরি হয়।

  • সুগন্ধির বিচিত্র সম্ভার: এখানে মিলবে শামামা (Shamama), রুহ গোলাপ (Rooh Gulab), রুহ খাস (Khus), মজমুয়া, জুঁই, চামেলী, রজনীগন্ধা, উদ (Oudh), আম্বর ও বেলা আতর। এ ছাড়া বিরিয়ানি ও ফিরনিতে ব্যবহারের খাদ্যোপযোগী সুগন্ধি জল (গোলাপ জল ও কেওড়া জল) এবং খাঁটি সুরমাও এখানে পাওয়া যায়।
  • সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা: কলকাতার বহু পরিবারে বিয়ের মৌসুমেও ক্রেতাদের লম্বা লাইন পড়ে এখানে। সামান্য ৫০-১০০ টাকা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানের রাজকীয় আতর ৩৫,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি হয়।

কলকাতার প্রথম সুগন্ধীর দোকান

কলকাতার বদলাতে থাকা আধুনিক রূপের মাঝে ‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’ কেবল একটি পারফিউমের দোকান নয়; এটি তিলোত্তমা কলকাতার কালজয়ী ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক সুবাসিত দলিল। খাঁটি প্রাকৃতিক সৌরভ আর দুই শতাব্দীর স্মৃতি নিয়ে এই দোকান আজও বিশ্বজুড়ে সুগন্ধিপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

 
ABOUT THE AUTHOR
Suman Roy

সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।

SHARE THIS ARTICLE ON
Hindustantimes wants to start sending you push notifications. Click allow to subscribe