ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের শহর কলকাতা। উত্তর কলকাতার চিৎপুর, জাকারিয়া স্ট্রিট এবং মৌলানা শওকত আলী স্ট্রিটের মেঠো গলিতে আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক সুপ্রাচীন সুবাস—যা ভিক্টোরিয়ান কলকাতার আভিজাত্য ও নবাবী আমলের সুগন্ধির স্মৃতিকথা বহন করে চলেছে। এই সুবাসের মূল উৎস হলো ‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’ (Haji Khuda Bukhsh Nabi Bukhsh)—যা কলকাতার সর্বপ্রাচীন পারফিউম বা আতরের দোকান হিসেবে পরিচিত।

১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সুগন্ধির দোকানটির বয়স ২০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আধুনিক বহুজাতিক সুগন্ধি ব্র্যান্ড আর স্প্রে ডেওডোরান্টের ভিড়ে আজও এই দোকানটি ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে স্বমহিমায় টিকে রয়েছে। লখনউয়ের নবাবী সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর মতো মহান ব্যক্তিত্বদের পদাঙ্কধন্য এই ঐতিহাসিক পারফিউম শপের জন্ম ও বিকাশের রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
১. যেভাবে শুরু হয়েছিল এই সুগন্ধির দোকান: লখনউ থেকে কলকাতার যাত্রা
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (১৮০০ সাল নাগাদ) লখনউতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অযোধ্যার নবাবদের ক্ষমতা হারানো এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই সময় লখনউয়ের প্রখ্যাত সুগন্ধি কারিগর শেখ জান মুহাম্মদ নিজের পরিবার নিয়ে লখনউ ছেড়ে তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় চলে আসেন।
কলকাতার সমৃদ্ধশালী জমিদার, রাজা এবং বনেদি বাবু সম্প্রদায় আগে থেকেই লখনউয়ের তৈরি সুগন্ধি বা আতরের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। তাই বাংলার আভিজাত্যের চাহিদাকে সম্মান জানিয়ে শেখ জান মুহাম্মদ প্রথমে বেলেঘাটায় বসবাস শুরু করেন এবং শিয়ালদহ এলাকায় সুগন্ধি তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। এরপর ১৮২৪ সালে উত্তর কলকাতার মৌলানা শওকত আলী স্ট্রিটে (কলুটোলা/বড়বাজারের কাছে) তিনি ও তাঁর দুই সন্তান হাজী খোদা বক্স এবং হাজী নবী বক্স একটি স্থায়ী দোকান চালু করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় কলকাতার প্রথম এবং প্রাচীনতম সুগন্ধির প্রতিষ্ঠান—‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’।
২. রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি ও নেহেরু: ইতিহাসের দিকপাল গ্রাহকেরা
এই দোকানটি কেবল ব্যবসার কেন্দ্র ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন বাংলার বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবীদের এক অন্যতম পছন্দের স্থান। বর্তমানে এই পরিবারের অষ্টম প্রজন্ম ঐতিহ্যের এই ধারা পরিচালনা করছেন।
- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা এই দোকানের নিয়মিত ক্রেতা ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির উৎসব-অনুষ্ঠানে এই ঐতিহ্যবাহী আতর পাঠানো হতো।
- নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু: ১৯৪০-এর দশকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে প্রায়শই এই দোকানে আসতেন। তিনি গোলাপ (Rooh Gulab) এবং রজনীগন্ধার সুগন্ধি আতর ভীষণ পছন্দ করতেন।
- অন্যান্য দিকপাল ব্যক্তিবর্গ: কাজী নজরুল ইসলাম, মতিলাল নেহেরু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং জেনারেল শাহ নওয়াজ খানের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা যখনই কলকাতায় আসতেন, এই দোকান থেকে খাঁটি আতর সংগ্রহ করতেন।
৩. ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুতপ্রণালী ও বর্তমান জনপ্রিয়তা
{{/usCountry}}এই দোকানটি কেবল ব্যবসার কেন্দ্র ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন বাংলার বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবীদের এক অন্যতম পছন্দের স্থান। বর্তমানে এই পরিবারের অষ্টম প্রজন্ম ঐতিহ্যের এই ধারা পরিচালনা করছেন।
- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা এই দোকানের নিয়মিত ক্রেতা ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির উৎসব-অনুষ্ঠানে এই ঐতিহ্যবাহী আতর পাঠানো হতো।
- নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু: ১৯৪০-এর দশকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে প্রায়শই এই দোকানে আসতেন। তিনি গোলাপ (Rooh Gulab) এবং রজনীগন্ধার সুগন্ধি আতর ভীষণ পছন্দ করতেন।
- অন্যান্য দিকপাল ব্যক্তিবর্গ: কাজী নজরুল ইসলাম, মতিলাল নেহেরু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং জেনারেল শাহ নওয়াজ খানের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা যখনই কলকাতায় আসতেন, এই দোকান থেকে খাঁটি আতর সংগ্রহ করতেন।
৩. ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুতপ্রণালী ও বর্তমান জনপ্রিয়তা
{{/usCountry}}আজকের দিনের বেশিরভাগ বাণিজ্যিক পারফিউমে অ্যালকোহল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করা হলেও, ‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’-এ আজও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী ‘ডেগ-ভাপকা’ (Deg-Bhapka) স্টিম ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে সুগন্ধি তৈরি করা হয়। উত্তর প্রদেশের কনৌজ ও কলকাতায় নিজেদের কারখানায় ফুল, কাঠ ও মশলার রস নিষ্কাশন করে চন্দন কাঠের তেলের (Sandalwood oil) সাথে মিশিয়ে মাসব্যাপী প্রক্রিয়াজাত করে এই সুগন্ধি তৈরি হয়।
- সুগন্ধির বিচিত্র সম্ভার: এখানে মিলবে শামামা (Shamama), রুহ গোলাপ (Rooh Gulab), রুহ খাস (Khus), মজমুয়া, জুঁই, চামেলী, রজনীগন্ধা, উদ (Oudh), আম্বর ও বেলা আতর। এ ছাড়া বিরিয়ানি ও ফিরনিতে ব্যবহারের খাদ্যোপযোগী সুগন্ধি জল (গোলাপ জল ও কেওড়া জল) এবং খাঁটি সুরমাও এখানে পাওয়া যায়।
- সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা: কলকাতার বহু পরিবারে বিয়ের মৌসুমেও ক্রেতাদের লম্বা লাইন পড়ে এখানে। সামান্য ৫০-১০০ টাকা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানের রাজকীয় আতর ৩৫,০০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি হয়।
কলকাতার বদলাতে থাকা আধুনিক রূপের মাঝে ‘হাজী খোদা বক্স নবী বক্স’ কেবল একটি পারফিউমের দোকান নয়; এটি তিলোত্তমা কলকাতার কালজয়ী ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক সুবাসিত দলিল। খাঁটি প্রাকৃতিক সৌরভ আর দুই শতাব্দীর স্মৃতি নিয়ে এই দোকান আজও বিশ্বজুড়ে সুগন্ধিপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।