First fish market of Kolkata: বাঙালির জীবনের সাথে মাছ আর ভাত যেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাধা। রুই, কাতলা, ইলিশ কিংবা চুনোমাছ—দুপুরের পাতে এক টুকরো মাছ না থাকলে যেন ভোজনরসিক বাঙালির খাওয়াটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর মাছের এই ভালোবাসার টানেই কলকাতার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মাছের বাজার। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, তিলোত্তমা কলকাতার বুকে গড়ে ওঠা সবথেকে প্রথম এবং প্রাচীন মাছের বাজার কোনটি?

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে, ব্রিটিশ আমলে কলকাতার প্রথম সুসংগঠিত মাছের বাজার পথ চলা শুরু করেছিল। সেই প্রথম মাছের বাজারের সূচনা, তার গৌরবময় ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক।
১৭০০ শতকের শেষের দিকে কলকাতা যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়েই শহরের উত্তর অংশে সূত্রপাত হয় শহরের প্রথম মাছ বাজারের। মধ্য কলকাতার পোদ্দার কোর্ট এবং সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের কাছাকাছি ছাতাওয়ালা গলির এই অঞ্চলটি আজও কলকাতার অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই বাজার?
এই বাজারের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক ইতালীয় নাগরিকের হাত। তাঁর নাম ছিল এডওয়ার্ড টায়রেটা (Edward Tiretta)। তিনি ছিলেন ইতালির ভেনিস শহরের বাসিন্দা, যিনি কোনো এক রাজনৈতিক কারণে নিজের দেশ ছেড়ে প্রথমে পারস্য এবং পরে ১৭৭০-এর দশকে কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। টায়রেটা সাহেব ছিলেন একজন পেশাদার স্থপতি বা আর্কিটেক্ট। লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে তিনি কলকাতার ‘সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ স্ট্রিটস অ্যান্ড বিল্ডিংস’ পদে নিযুক্ত হন।
১৭৮০-র দশকে এডওয়ার্ড টায়রেটা উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে একটি বিশাল জমি কেনেন এবং সেখানে একটি সুসংগঠিত বাজার গড়ে তোলেন। সেই সময়েই কলকাতার মানুষ প্রথম এক ছাদের তলায় সবজি, মাংস এবং বিশেষ করে টাটকা মাছ কেনার সুযোগ পায়। টায়রেটা সাহেবের নামানুসারেই এই বাজারের নাম হয় ‘তেরেট্টি বাজার’। বর্তমানে যা তেরিটি বাজার বা টেরিটি বাজার নামে পরিচিত। ১৭৮৮ সালের একটি ঐতিহাসিক মানচিত্রেও এই বাজারের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে এটিই ছিল কলকাতার প্রথম পরিকল্পিত বাজার।
কোথা থেকে আসত মাছ?
{{/usCountry}}১৭৮০-র দশকে এডওয়ার্ড টায়রেটা উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলে একটি বিশাল জমি কেনেন এবং সেখানে একটি সুসংগঠিত বাজার গড়ে তোলেন। সেই সময়েই কলকাতার মানুষ প্রথম এক ছাদের তলায় সবজি, মাংস এবং বিশেষ করে টাটকা মাছ কেনার সুযোগ পায়। টায়রেটা সাহেবের নামানুসারেই এই বাজারের নাম হয় ‘তেরেট্টি বাজার’। বর্তমানে যা তেরিটি বাজার বা টেরিটি বাজার নামে পরিচিত। ১৭৮৮ সালের একটি ঐতিহাসিক মানচিত্রেও এই বাজারের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে এটিই ছিল কলকাতার প্রথম পরিকল্পিত বাজার।
কোথা থেকে আসত মাছ?
{{/usCountry}}সেই আড়াইশো বছর আগে আজকের মতো উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা বা কোল্ড স্টোরেজ ছিল না। ফলে কলকাতার মানুষের পাতে টাটকা মাছ পৌঁছে দেওয়া ছিল এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। তেরেট্টি বাজারে মাছ আসার প্রধান উৎস ছিল দুটি:
১. হুগলি নদী ও স্থানীয় পুকুর: কলকাতার কোল ঘেঁষে বয়ে চলা হুগলি নদী (গঙ্গা) থেকে প্রতিদিন ভোরে জেলেরা টাটকা রুই, কাতলা, ইলিশ, তপসে এবং চিংড়ি মাছ ধরে সরাসরি তেরেট্টি বাজারে নিয়ে আসতেন। এছাড়া তৎকালীন কলকাতার পূর্ব ও উত্তর শহরতলির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বড় বড় জমিদারী পুকুর ও ভেড়ি থেকেও মাছ আসত।
২. পূর্ব কলকাতার জলাভূমি (East Kolkata Wetlands): তেরেট্টি বাজার জনপ্রিয় হওয়ার সাথে সাথে মাছের চাহিদাও বিপুল হারে বাড়তে থাকে। এই চাহিদা মেটাতে সাহায্য করেছিল পূর্ব কলকাতার নোনা জলের ও মিষ্টি জলের বিশাল ভেড়িগুলো। মাঝরাতে সেখান থেকে মাছ ধরে নৌকো বা গরুর গাড়িতে করে ভোরের আলো ফোটার আগেই তেরেট্টি বাজারের আড়তে পৌঁছে দেওয়া হতো।
তেরেট্টি বাজারের বর্তমান রূপ: চিনা সংস্কৃতির ছোঁয়া
সময়ের সাথে সাথে তেরেট্টি বাজারের রূপ অনেকটাই বদলে গেছে। ১৯ শতকের শুরুর দিকে কলকাতায় চিনা অভিবাসীদের আগমন ঘটে এবং তারা এই তেরেট্টি বাজার অঞ্চলেই বসতি স্থাপন করে, যা আজ কলকাতার ‘ওল্ড চায়না টাউন’ নামে পরিচিত।
আজকের আধুনিক কলকাতায় তেরেট্টি বাজার কেবল মাছের বাজারের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত তার ‘চায়নিজ ব্রেকফাস্ট’ (Chinese Breakfast)-এর জন্য। প্রতিদিন ভোরে যখন মাছের আড়তগুলো খোলে, ঠিক তখনই তার পাশাপাশি চিনা বিক্রেতারা মোমো, ডাম্পলিং, বাও এবং সুস্বাদু স্যুপের পসরা নিয়ে বসেন। প্রাচীন কলকাতার মাছের বাজার এবং চিনা সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন আজও এই বাজারকে অনন্য করে রেখেছে।
তেরেট্টি বাজার কেবল কলকাতার প্রথম মাছের বাজার নয়, এটি কলকাতার আড়াইশো বছরের ইতিহাস, বিবর্তন এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। মাছ-প্রেমী বাঙালির মাছের বাজারের আদি উৎসকে জানতে হলে এই ঐতিহাসিক বাজারে একবার ঢুঁ মারা রাজকীয় অভিজ্ঞতার চেয়ে কম কিছু নয়।