‘নহি যন্ত্র আমি প্রাণী’…আপাতভাবে প্রাণহীন কিছু রাসায়নিক পদার্থ যেন তেমনটাই বলতে চাইছিল বহুদিন ধরে। কিন্তু পারছিল না। অবশেষে তাঁর গবেষণার মন্ত্রবলে ‘প্রাণী’ হয়ে উঠল তারা। এই যুগান্তকারী গবেষণার উপর ভর করেই ২০২৫ সালে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার পেলেন IISER কলকাতার গবেষক দিব্যেন্দু দাস। প্রাণহীন কিছু রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেছে তাঁর গবেষণা। আগামী দিনে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা পথপ্রদর্শক হতে পারে কৃত্রিম জীবন তৈরির প্রকল্পে। সম্প্রতি এই গবেষণা ও পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়েই হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা কথা বলল গবেষক দিব্যেন্দু দাসের সঙ্গে।

হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: ভারতের প্রথম সারির বিজ্ঞান বিষয়ক পুরস্কারে সম্মানিত হয়ে কেমন অনুভূতি হচ্ছে?
দিব্যেন্দু: ভীষণ সম্মানিত বোধ করছি। শুধু আমি নয়, আমার বিভাগের জন্যও খুশির খবর এটা। সিস্টেমস কেমিস্ট্রি নামে রসায়নের একটি বিশেষ শাখা নিয়ে আমাদের কাজ। সেই শাখাটিও একই সঙ্গে সম্মানিত হল এই পুরস্কার প্রাপ্তির ফলে।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: আপনার গবেষণার বিষয়বস্তুটি একটু সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন।
দিব্যেন্দু: আপাতপক্ষে, আমাদের প্রকৃতিতে কার্বন, হাইড্রোজেন সমন্বিত বহু রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো নির্জীব, এর মধ্যে কোনও প্রাণের হদিশ পাবেন না। এগুলোই যখন বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে, তখন তার মধ্যে প্রাণের ধর্ম দেখা দিচ্ছে। সৃষ্টির আদিকালে প্রাণও তৈরি হয়েছিল এভাবেই। লক্ষ্য করবেন, একটি প্রাণ নিজে থেকে চলাফেরা করে, খাওয়াদাওয়া করে, কোশবিভাজন ঘটিয়ে বংশবিস্তার করে। এই পদার্থের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগের সংমিশ্রণে তৈরি এই সব পদার্থ নিজে থেকেই বেড়ে উঠছে, বিভাজিত হচ্ছে, আবার মরেও যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে মানে একদম চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এই লাইফ-লাইক মেটেরিয়ালগুলিই (অর্থাৎ প্রাণসুলভ কিছু পদার্থ) তৈরি হচ্ছে গবেষণাগারের মধ্যেই। আমাদের এই সমগ্র গবেষণা প্রকল্পের নাম ‘লিভিং ম্যাটার লাইক প্রপার্টিজ বাই সিম্পল কেমিকাল বিল্ডিং ব্লক’। আগামী ১৫ বছরে এই গবেষণাই আরও উন্নত করার ইচ্ছে রয়েছে।
{{/usCountry}}দিব্যেন্দু: আপাতপক্ষে, আমাদের প্রকৃতিতে কার্বন, হাইড্রোজেন সমন্বিত বহু রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো নির্জীব, এর মধ্যে কোনও প্রাণের হদিশ পাবেন না। এগুলোই যখন বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে, তখন তার মধ্যে প্রাণের ধর্ম দেখা দিচ্ছে। সৃষ্টির আদিকালে প্রাণও তৈরি হয়েছিল এভাবেই। লক্ষ্য করবেন, একটি প্রাণ নিজে থেকে চলাফেরা করে, খাওয়াদাওয়া করে, কোশবিভাজন ঘটিয়ে বংশবিস্তার করে। এই পদার্থের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগের সংমিশ্রণে তৈরি এই সব পদার্থ নিজে থেকেই বেড়ে উঠছে, বিভাজিত হচ্ছে, আবার মরেও যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে মানে একদম চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এই লাইফ-লাইক মেটেরিয়ালগুলিই (অর্থাৎ প্রাণসুলভ কিছু পদার্থ) তৈরি হচ্ছে গবেষণাগারের মধ্যেই। আমাদের এই সমগ্র গবেষণা প্রকল্পের নাম ‘লিভিং ম্যাটার লাইক প্রপার্টিজ বাই সিম্পল কেমিকাল বিল্ডিং ব্লক’। আগামী ১৫ বছরে এই গবেষণাই আরও উন্নত করার ইচ্ছে রয়েছে।
{{/usCountry}}হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: আমরা অরগ্যানিক কেমিস্ট্রি, ইনরগ্যানিক কেমিস্ট্রি। কিন্তু আপনার বিষয় সিস্টেম কেমিস্ট্রি। এটি আদতে কী? এটার মূল লক্ষ্য কী?
দিব্যেন্দু: সিস্টেম কেমিস্ট্রি আদতে একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি সাবজেক্ট। এতে ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রির ধারণা যেমন লাগে, আবার অরগ্যানিক কেমিস্ট্রির ইকুয়েশনও লাগে, অন্যদিকে দরকার পড়ে ফিজিক্সও। ফলে একজন বিজ্ঞানীকে রসায়নের পাশাপাশি এই শাখায় কাজ করার জন্য পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং জানতে হয়। সিস্টেমস কেমিস্ট্রির লক্ষ্যও খুব ফান্ডামেন্টাল। কীভাবে জীবনের উৎপত্তি হল এত কোটি বছর আগে, কীভাবে জীবগোষ্ঠীর বিবর্তন হল ইত্যাদি নিয়েই এই বিশেষ রসায়নবিদ্যার চর্চা।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: বর্তমানে কৃত্রিম মেধা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের মেধা বা খাটনির বিকল্প হয়ে উঠছে। আপনার এই কৃত্রিম প্রাণ নিয়ে গবেষণা কি ভবিষ্যতে কৃত্রিম মেধায় কিছু অবদান রাখতে পারে?
দিব্যেন্দু: খুব ভালো প্রশ্ন। আর্টিফিশিয়াল লাইফ একটি কেমিকাল বেসড ধারণা। অন্যদিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টেকনিকাল বেসড ধারণা। এবার দুইয়ের মেলবন্ধন খুব সুন্দরভাবেই হতে পারে। ভবিষতের গবেষণায় আমাদের ফিল্ডে যেমন এআই দরকার হতে পারে। আবার এআইয়ের ফিল্ডে আমাদের দরকার পড়তে পারে।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বর্তমানে জেনারেটিভ এআই নিয়ে অনেকটাই এগিয়েছে। কিন্তু ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স আর মানুষের জটিল আচরণ বুঝতে এখনও তার সময় লাগবে কিছুটা। এই ব্যাপারে আপনার গবেষণা পথপ্রদর্শক হতে পারে?
দিব্যেন্দু: খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের গবেষণা প্রাণসুলভ পদার্থ আবিষ্কারের চেষ্টা শুরু করেছে। কিন্তু মানুষের আচরণের নেপথ্যে রয়েছে জটিল মানসিক গড়ন, আবার মনের নেপথ্যে রয়েছে ব্রেনের জটিল গড়ন। ফলে সেখানে পৌঁছাতে এখনও বেশ কিছুটা সময় লেগে যাবে। কিন্তু একই সঙ্গে বলি, এই বিশেষ প্রাণসুলভ পদার্থগুলি রোগ সারাতেও যথেষ্ট উপকারী হতে পারে। কারণ এই পদার্থগুলি শরীরের চাহিদা বুঝে সেই মতো ওষুধের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: মানে আপনার কথা অনুযায়ী, এই পদার্থগুলি ওষুধের সাইড এফেক্টও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
দিব্যেন্দু: একেবারেই তাই। আমরা জ্বর হলেই প্যারাসিটামল খাই। এই প্যারাসিটামল কিন্তু আমাদের শরীরে সবটা প্রয়োজন হয় না। অনেকটাই বেরিয়ে যায় কিডনির মাধ্যমে। কিন্তু ‘লিভিং মেটেরিয়াল লাইক’ পদার্থ শরীরে গেলে, এটি ওষুধ যতটা প্রয়োজন ততটাই সরবরাহ করবে। বাকিটা সংরক্ষণ করতে পারবে। আবার পরে যখন দরকার, তখন ফের দেবে। পাশাপাশি শরীরের যেই অংশে সমস্যা শুধু সেই অংশেই পৌঁছে দিতে পারবে ওষুধকে। এর ফলে বেশি ওষুধ যেমন দরকার পড়বে না, তেমন চিকিৎসাও ভালো হবে। এই বিষয়েও আমরা গবেষণা করার কথা ভাবছি। এটা আমাদের আগামীদিনের গবেষণাগুলির মধ্যে অন্যতম গবেষণাও হতে পারে।
হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা: গবেষণার ক্ষেত্রে পরিকাঠামোর দিক থেকে কোন কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় আপনাকে বা আপনার মতো গবেষককে? আর্থিক সাহায্যের দিক থেকে কোন কোন দিকে এখনও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন?
দিব্যেন্দু: আর্থিক সাহায্য ও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে বর্তমানে সরকার অনেকটাই ফান্ডের ব্যবস্থা করছেন। এছাড়াও অনুসন্ধান ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (Anusandhan National Research Foundation - ANRF) তরফেও ফান্ডিং দেওয়া হয়ে থাকে। আগে ফান্ডের অভাবে বহু গবেষণাই কম্প্রোমাইজ হত। কিন্তু এখন সেই সমস্যা অনেকটাই কমেছে। বরং পরিস্থিতি আরও উন্নত হচ্ছে।
সাক্ষাৎকার: সংকেত ধর