...
...
Next Story

Lightning in Kolkata: সারা দুপুর তুমুল বজ্রপাত ও বৃষ্টি কলকাতা-সহ আশপাশে! বাজ পড়া কি বাড়ছে? পিছনে কোন ভয়ঙ্কর কারণ

গ্রামীণ ক্ষেত্র থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল—সবত্রই বজ্রাঘাতে আহত ও নিহতের সংখ্যা এক লাফে অনেক বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন গাঙ্গেয় অববাহিকায় এত ঘন ঘন বাজ পড়ছে? কেবল খামখেয়ালি আবহাওয়া নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ ও ভৌগোলিক পরিবর্তন?

Published on: Sep 8, 2026, 15:44:49 IST
Advertisement

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ও জনবহুল এলাকা গাঙ্গেয় বদ্বীপ (Gangetic Delta)—যার বড় একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ জুড়ে বিস্তৃত। বিগত কয়েক বছর ধরে এই বিশাল বদ্বীপ অঞ্চলে কালবৈশাখীর সময় বা বর্ষার প্রাক্কালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে 'বজ্রপাত' বা বিদ্যুৎপাতের রূপ অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ ক্ষেত্র থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল—সবত্রই বজ্রাঘাতে আহত ও নিহতের সংখ্যা এক লাফে অনেক বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন গাঙ্গেয় অববাহিকায় এত ঘন ঘন বাজ পড়ছে? কেবল খামখেয়ালি আবহাওয়া নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে গভীর কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ ও ভৌগোলিক পরিবর্তন? চলুন দেখে নেওয়া যাক কী বলছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ।

১. গাঙ্গেয় বদ্বীপে বজ্রপাতের পরিসংখ্যান কী বলছে?

বাজ পড়ার প্রবণতা কেন বাড়ছে কলকাতা-সহ গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায়? কী বলছে বিজ্ঞান
বাজ পড়ার প্রবণতা কেন বাড়ছে কলকাতা-সহ গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায়? কী বলছে বিজ্ঞান

ভারত সরকারের আবহাওয়া দপ্তর (IMD) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থার পেশ করা সাম্প্রতিক তথ্য ও রিপোর্ট অনুযায়ী, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান ‘হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে:

  • আহতের ও নিহতের পরিসংখ্যান: ভারতে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)-র রিপোর্ট অনুসারে, প্রতি বছর কেবল পশ্চিমবঙ্গেই বজ্রাঘাতে মারা যান গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন মানুষ, যার সিংহভাগই গ্রামীণ এলাকার কৃষক ও খেতমজুর। বাংলাদেশেও এই সংখ্যা প্রতি বছর কয়েকশো ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
  • বজ্রপাতের ফ্রিকোয়েন্সি বা সংখ্যা বৃদ্ধি: কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত দুই দশকে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় 'ক্লাউড-টু-গ্রাউন্ড' (Cloud-to-Ground) অর্থাৎ মেঘ থেকে সরাসরি মাটিতে আছড়ে পড়া বজ্রপাতের সংখ্যা প্রতি বছর প্রায় ১৫% থেকে ২০% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২. তীব্র বিদ্যুৎপাতের বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ

ক) বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি (Global Warming): বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়লে তা বাতাস আর্দ্র রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ধরে রাখার ক্ষমতা প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। গাঙ্গেয় বদ্বীপে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগমন ঘটে, যা বিশাল আকৃতির গভীর 'কুমুলোনিম্বাস' (Cumulonimbus) বা বজ্রমেঘের সৃষ্টি করে।

খ) বঙ্গোপসাগরের উপস্থিতি ও প্রাক-বর্ষার অবস্থান: দক্ষিণে থাকা বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস গাঙ্গেয় বদ্বীপের দিকে ধেয়ে আসে। অন্যদিকে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক বাতাসের সাথে সংঘাত ঘটে। এই দুই বিপরীতধর্মী বাতাসের সংঘর্ষে মেঘের ভেতরের জলকণা ও বরফকণার মধ্যে প্রচণ্ড ঘর্ষণ ঘটে, যা উচ্চ মাত্রার ধনাত্মক ও ঋণাত্মক তড়িৎ আধান বা ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি করে।

গ) নগরায়ন ও কংক্রিটের তাপীয় প্রভাব (Urban Heat Island): গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে দ্রুত গতিতে গাছপালা কেটে নগরায়ন ও কনক্রিটের নির্মাণকাজ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা আরও বাড়ে এবং বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা বজ্রমেঘ তৈরি করার আদর্শ পরিবেশ জোগায়।

ঘ) বাতাসে দূষণ ও অ্যারোসল কণার বৃদ্ধি: শিল্পকারখানা ও যানবাহনের অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে বাতাসে অ্যারোসল (Aerosol) কণার পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই ক্ষুদ্র অ্যারোসল কণাগুলো মেঘের ভেতর জলের ফোঁটাকে আরও ছোট ও ঘনীভূত করে দেয়, যার ফলে মেঘের চার্জ আদান-প্রদান তীব্র হয় এবং প্রচণ্ড বেগে বাজ পড়ে।

৩. তালগাছ লোপ ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি

আগে গ্রামীণ অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যায় তালগাছ, বট ও অশ্বত্থের মতো দীর্ঘকায় গাছ দেখা যেত। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অতিরিক্ত লম্বা গাছগুলো প্রাকৃতিক 'লাইটিং এরস্টার' বা বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত। বজ্রপাত হলে অধিকাংশ সময়েই তা কোনো খোলা মাঠের মানুষের ওপর না পড়ে উঁচু তালগাছে আঘাত করত এবং বিদ্যুৎ মাটির গভীরে চলে যেত।

কিন্তু গত কয়েক দশকে নির্বিচারে তালগাছ কাটা ও গ্রামীণ বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করার ফলে উন্মুক্ত মাঠে কাজ করা কৃষক ও সাধারণ মানুষ সরাসরি লাইটনিং বা বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন। এছাড়া পকেটে থাকা স্মার্টফোন কিংবা মেটাল অবজেক্টের ব্যবহারও অনেক সময় পরোক্ষ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৪. সমাধান ও জীবনরক্ষাকারী আগাম সতর্কতা

বজ্রপাতের মতো মারাত্মক দুর্যোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে আগাম সতর্কতা ও সচেতনতার মাধ্যমে নিহতের সংখ্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব:

  • আবহাওয়ার পূর্বাভাস অ্যাপস ব্যবহার: সরকার ও আবহাওয়া দপ্তরের লঞ্চ করা অ্যাপস (যেমন—'দামিনী' বা 'Damini App') আধা ঘণ্টা আগেই নির্দিষ্ট এলাকায় বজ্রপাতের আগাম বার্তা দিয়ে থাকে।
  • উন্মুক্ত মাঠ এড়িয়ে চলা: মেঘের ডাক শুনলে বা বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে ফাঁকা মাঠ বা পুকুর ছেড়ে পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত।
  • প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক গাছ রোপণ: সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে গাঙ্গেয় বদ্বীপ জুড়ে আবার ব্যাপক হারে তালগাছ ও বড় বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

গাঙ্গেয় বদ্বীপে বিদ্যুৎপাতের এই মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক আশঙ্কাজনক লাল সংকেত। পরিবেশ রক্ষা, সবুজায়ন ও সঠিক সতর্কতাই পারে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে এই বিশাল উপকূলীয় মানবসমাজকে রক্ষা করতে।

 
ABOUT THE AUTHOR
Suman Roy

সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।

SHARE THIS ARTICLE ON
Notifications

Get breaking alerts directly from the newsroom

Notifications are on!You'll be notified when news breaks