...
...
Next Story

Taslima Nasrin's return to Kolkata: মতামত- পশ্চিমবঙ্গে তসলিমার প্রত্যাবর্তন আসলে মৌলবাদের বিরুদ্ধে এক বিরাট বার্তা

Taslima Nasrin return to Kolkata: ‘পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তসলিমার প্রত্যাবর্তন আসলে মৌলবাদের বিরুদ্ধে এক বিরাট বার্তা’- লিখলেন সাহিত্যিক প্রত্যূষা সরকার। কেন ২০ বছর পরে তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তন এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা? তুলে ধরলেন নিজের মতামত।

Published on: Jul 14, 2026, 20:52:36 IST
Advertisement

Taslima Nasrin return to Kolkata: সাল ১৯৯৪, লেখিকার মাথার দাম ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করে বাংলাদেশ। আসলে ১৯৯২-৯৩ সালে বাংলাদেশে সৃষ্ট হিংসার প্রেক্ষাপটে তসলিমা লিখেছিলেন তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘লজ্জা’। যেখানে মূল বিষয়বস্তু ছিল, বাংলাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিপর্যয়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ দত্ত পরিবার, বাবা সুধাময়, মা কিরণময়ী, ছেলে সুরঞ্জন এবং মেয়ে নীলাঞ্জনা। এই উপন্যাসে মূলত উঠে আসে বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু দ্বন্দ্বের নির্মম রূপ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। ১৯৯৩ সালে প্রথম প্রকাশের পর এই বইটিকে বাংলাদেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। জানা যায় প্রথম ছ' মাসে 'লজ্জা-র প্রায় ৫০,০০০ কপি বিক্রি হয়েছিল। শুনলে অবাক হবেন, ইংরেজি ছাড়াও পরবর্তীতে একাধিক ভাষায় এই উপন্যাসের অনুবাদ হয়, যেমন ফরাসি, ওলন্দাজ, জার্মান, স্পেনীয়, ইতালীয়, সুয়েডীয়, নরওয়েজীয়, ফিনীয়, আইসল্যান্ডীয়, ফার্সি, আরব, অসমিয়া, কন্নড়, হিন্দি, গুজরাটি, ওড়িয়া, উর্দু, মারাঠি, তেলুগু, তামিল, পাঞ্জাবি, নেপালি, মালয়লম এবং সিংহলি।

কলকাতায় সেনা পর্যন্ত নামাতে হয়েছিল বাম সরকারকে

১ অগস্ট রবীন্দ্র সদনে আছে তসলিমা নাসরিনের অনুষ্ঠান। (ছবি সৌজন্যে, ফেসবুক Taslima Nasrin)
১ অগস্ট রবীন্দ্র সদনে আছে তসলিমা নাসরিনের অনুষ্ঠান। (ছবি সৌজন্যে, ফেসবুক Taslima Nasrin)

এরপর আমেরিকা ও ইউরোপে কয়েক বছর কাটানোর পর ২০০৪ সালে তসলিমা নাসরিন কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন। এমনকী কলকাতায় তিনি নিজের একটি বাড়ি করে পাকাপাকিভাবে থাকতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর এ' শহর মুখ ফিরিয়ে নেয় হঠাৎ। তাঁর লেখা 'দ্বিখণ্ডিত' উপন্যাসকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা। মৌলবাদী শক্তির আগ্রাসন ও অশান্তি সামলাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারকে সেনা পর্যন্ত নামাতে হয়েছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কারণে তাঁকে শহর ছাড়তে একরকম বাধ্যই করা হয়। সেইসময় অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরামের ছত্রছায়ায় কয়েকজন প্রতিবাদকারী তসলিমাকে কলকাতায় থাকতে না দেওয়ার দাবি তোলে। এরপর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাঁকে রাজ্য ছাড়ার নির্দেশ দেয়।

‘কলকাতা আমার বাড়ি’, সেই ২০০৭ সালে বলেছিলেন তসলিমা নাসরিন

২০০৭ সালে রাজস্থানের জয়পুর থেকে 'দ্য হিন্দু' পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তসলিমা বলেছিলেন, ‘আমি প্রতিদিন স্বপ্ন দেখি পশ্চিমবঙ্গ এবং কলকাতায় ফিরে যাওয়ার। কলকাতা আমার বাড়ি এবং আমি ফিরে আসতে মরিয়া।’ অথচ কলকাতার তৎকালীন বামপন্থী সেক্যুলাররা তাঁকে আশ্রয় দেয়নি। একসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ রাজ্য এই পশ্চিমবঙ্গ, সেখান থেকেও শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয় বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত এই লেখিকাকে।

‘মৌলবাদ-বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’-র আগমন

লেখিকা কোনওদিনই সাহিত্যে আপস করেননি। ধর্মের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার সমালোচনা করতে গিয়ে বারংবার তাঁকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। আর নারী স্বাধীনতার বার্তায়, পুরুষতন্ত্রের প্রতিবাদে তাঁর কলমকে নিয়ে নতুন করে কীই বা বালি! তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে উঠে এসেছে নারীদের স্বাধীনতা, বিপ্লব ও আগুনের কথা, আত্মজন্মের কথা। আর সেই আগুন নেভাতে চেয়ে প্রশাসনের ভূমিকা বরাবরের মতো রক্ষণাত্মক, সে পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট হোক কিংবা সদ্য অতীত তৃণমূল সরকার। ২০১২ সালে কলকাতা বইমেলায় তসলিমার বই প্রকাশ অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ার ঘটনা এখনও দগদগে। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের মতো একটা পিছিয়ে পড়া ধর্মান্ধ দেশে যা স্বাভাবিক, আমাদের বিকশিত ভারতে তা কেন ঘটবে!

কলম কি থামতে পারে প্রকৃত লেখক বা লেখিকার?

সাহিত্য মানচিত্র রচনা করে, না মানচিত্র সাহিত্য? কেন ধর্মের উস্কানি দাঁড়িয়ে পড়ে সাহিত্যের কেন্দ্রে? ‘ব্যান’ আর যাই হোক, কলম থামাতে পারে কি প্রকৃত লেখক বা লেখিকার? আগুন জ্বলতেই থাকে। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার অপরাধে বাংলা ভাষার লেখিকাকে নির্বাসিত হতে হয়, সে লজ্জা আপামর বাঙালির। একসময় আশ্রয় দেওয়ার পরেও যে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আশ্রয় হারাতে হয়েছিল তসলিমাকে, সেই পশ্চিমবঙ্গেই ফেরার পথ খুলছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনিক করিডরে শুরু হয়েছে বহুদিনের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের পুনর্মূল্যায়ন। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত বাংলা ভাষার লেখিকা তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে সক্রিয় হয়েছে উদ্যোগ।

একজন লেখিকার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর বৃদ্ধি

এই প্রক্রিয়ার অন্যতম মুখ অবশ্যই রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছিলেন, মৌলবাদের বিরুদ্ধে আজীবন কলম চালানো এই লেখিকার বাংলায় ফিরে আসার সুযোগ পাওয়া উচিত। তাঁর সেই অবস্থান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরও জোরালো মাত্রা পায়। নতুন সরকারের আগমনে বহুদিনের সেই দাবির বাস্তব রূপ পেতে চলেছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। সমর্থকদের মতে, এটি শুধু একজন লেখিকার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর নিয়ে এক পুরনো বিতর্কের নতুন অধ্যায়।

তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তনের মঞ্চে থাকতে পারেন মুখ্যমন্ত্রীও

একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তসলিমার কবিতা, গান ও সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে বিশেষ পর্ব; ১ অগস্ট, ২০২৬। আয়োজকদের দাবি, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি আমাদের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিষয়ে ইতিবাচক সম্মতি জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা মোহিত রায়ের কথায়, তসলিমার পশ্চিমবঙ্গে আসার ক্ষেত্রে কোনও আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। তাঁর মতে, অতীতে রাজনৈতিক কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা মনে করেছেন, তসলিমাকে আবার কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরে স্বাগত জানানোর সময় এসেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য রাজনৈতিক নয়; বরং সাহিত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানানো। তবে তসলিমার সফরকে ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আয়োজকদের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখকের মতামত ব্যক্তিগত)

 
SHARE THIS ARTICLE ON
Hindustantimes wants to start sending you push notifications. Click allow to subscribe