তৃণমূলের দুই চিকিৎসক নেতা সুদীপ্ত রায় এবং শান্তনু সেনের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংঘাত এখনও থামেনি। এবার চিকিৎসকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বা আইএমএ-র ‘জিমা’ অ্যাকাউন্টে বিপুল টাকার লেনদেন নিয়ে একে অপরকে নিশানা করেছেন তাঁরা। সুদীপ্ত রায়ের অভিযোগ, অ্যাকাউন্টে প্রায় দেড় কোটি টাকার গরমিলের অভিযোগ উঠেছে এবং আইএমএ-র তদন্তে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়ার পরও কেন শান্তনু সেনের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই অভিযোগের সূত্রপাত প্রায় এক দশক আগে। ২০১৫ সালের জুনে জার্নাল অফ দ্য ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বা ‘জিমা’-র নামে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। অভিযোগ, সেখানে আইএমএ-র প্যান ব্যবহার করা হলেও সংগঠনের সদর দফতরকে বিষয়টি জানানো হয়নি। অ্যাকাউন্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন জিমা সম্পাদক শান্তনু সেন এবং যুগ্ম অর্থসচিব উজ্জ্বল সেনগুপ্ত। পরবর্তী সময়ে জিমার সম্পাদক হন কাকলি সেন, যিনি শান্তনু সেনের স্ত্রী।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ওই অ্যাকাউন্টে মোট ১ কোটি ৫৩ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা তোলা হয়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা নগদে তোলার বিষয়টিও। ২০২০ সালে দুটি চেক বাউন্স হওয়ার পর অ্যাকাউন্টটির অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে। তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, অ্যাকাউন্টটির ‘সাইনিং অথরিটি’ সময়মতো বদলানো হয়নি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের পদমর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আইএমএ তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত বছর কলকাতায় এসে কমিটির সদস্যেরা হিসাবরক্ষক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে জমা দেওয়া রিপোর্টে অ্যাকাউন্টের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। জিমার অডিটরও অ্যাকাউন্টটির বিষয়ে তাঁকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন।
{{/usCountry}}বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আইএমএ তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত বছর কলকাতায় এসে কমিটির সদস্যেরা হিসাবরক্ষক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে জমা দেওয়া রিপোর্টে অ্যাকাউন্টের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। জিমার অডিটরও অ্যাকাউন্টটির বিষয়ে তাঁকে জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন।
{{/usCountry}}তদন্তে একটি ১৭ লক্ষ টাকার চেক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। চেকটি ‘দিশা মেডিহেল্প’ নামে একটি সংস্থার উদ্দেশে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, চেকের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বরটি শান্তনু সেনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ওই সংস্থার কার্যালয়ও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। এই তথ্যকে সামনে রেখে সুদীপ্ত রায় আরও প্রশ্ন তুলেছেন, অ্যাকাউন্টে জমা পড়া টাকার উৎস কী ছিল এবং কত টাকা কোথায় খরচ হয়েছে।
অন্য দিকে, সুদীপ্ত রায়ের অভিযোগ মানতে নারাজ শান্তনু সেন। তাঁর দাবি, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলার পরই পুরনো এই বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচ জন ‘ভুয়ো চিকিৎসক’-এর ঘটনা সামনে আসার পর রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেই অভিযোগে সুদীপ্ত রায়-সহ কাউন্সিলের কয়েক জন আধিকারিকের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়ে পুলিশে অভিযোগও হয়েছে।
ফলে এক দিকে জিমার পুরনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং আইএমএ-র তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন, অন্য দিকে ভুয়ো চিকিৎসক ইস্যুতে মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা—দুই বিষয়কে ঘিরেই দুই চিকিৎসক নেতার চাপানউতোর আরও বেড়েছে।
জিমার অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত বিতর্কে বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও স্পষ্ট নয়। জিমার বর্তমান সম্পাদক মধুছন্দা কর জানিয়েছেন, অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকা প্রায় ২১ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকা জিমার বাড়ি তৈরির তহবিলে দেওয়ার পর অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করা হয়েছে বলে তিনি জানেন। তবে বাকি টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছে।
এখন নজর আইএমএ-র পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনও প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নাকি দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগেই বিষয়টি আটকে থাকবে, সেটাই দেখার।