আপনি কি ৫ কিলোমিটারের শর্ট রান পছন্দ করেন, নাকি সরাসরি ২৫ কিলোমিটারের দূরপাল্লার দৌড়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন? যে দূরত্বের জন্যই আপনি তৈরি হন না কেন, দৌড়বিদ হওয়ার মূল মন্ত্র কেবল প্রতিদিনের মাইল বা কিলোমিটার বাড়ানো নয়। এর পেছনে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ, সুষম পুষ্টি, শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার কৌশল এবং এক দৃঢ় মানসিকতা।

আগামী ২০ ডিসেম্বর (রবিবার) অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ‘টাটা স্টিল ওয়ার্ল্ড ২৫কে কলকাতা'। দৌড়বিদদের সঠিক পথ দেখাতে ও রেস-রেডি করার একগুচ্ছ টিপস শেয়ার করেছেন 'ওয়ান মোর্ রিপ'-এর প্রতিষ্ঠাতা তথা অভিজ্ঞ রানিং কোচ শ্বেতা লাখওয়ানি। ২০১৫ সাল থেকে রেসিংয়ে সঙ্গে যুক্ত শ্বেতা ভারতের একাধিক স্বনামধন্য দৌড়ে পোডিয়াম ফিনিশ করেছেন এবং বহুবার নামজাদা বোস্টন ম্যারাথনের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছেন। ৫০০-রও বেশি বুটক্যাম্প সেশন এবং ৪০ জনেরও বেশি অ্যাথলিটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তুলে ধরেছেন দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণের কৌশল।
দূরত্বের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ - টিপস শ্বেতার
১) ৫কে (5K): এই দূরত্বের জন্য মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রাথমিক কার্ডিও ফিটনেস গড়ে তোলা এবং দৌড়ানোর কৌশল বা রানিং এফিসিয়েন্সি নিখুঁত করা।
২) ১০কে (10K): ১০ কিলোমিটার দৌড়ের ক্ষেত্রে শুধু ফিটনেস যথেষ্ট নয়; অ্যারোবিক স্ট্যামিনা বা সহ্যক্ষমতার পাশাপাশি একটানা সমান পেস ধরে রাখার সক্ষমতা দরকার।
৩) ২৫কে (25K): দীর্ঘ দূরত্বের ২৫কে রেসে দীর্ঘক্ষণ ক্লান্ত না হয়ে দৌড়ানোর ক্ষমতা (Fatigue Resistance) প্রয়োজন। এর পাশাপাশি প্রয়োজন আগে থেকে বারবার অনুশীলন করা সঠিক ফুয়েলিং ও হাইড্রেশন স্ট্র্যাটেজি।
{{/usCountry}}৩) ২৫কে (25K): দীর্ঘ দূরত্বের ২৫কে রেসে দীর্ঘক্ষণ ক্লান্ত না হয়ে দৌড়ানোর ক্ষমতা (Fatigue Resistance) প্রয়োজন। এর পাশাপাশি প্রয়োজন আগে থেকে বারবার অনুশীলন করা সঠিক ফুয়েলিং ও হাইড্রেশন স্ট্র্যাটেজি।
{{/usCountry}}বিশেষ পরামর্শ: রেসের দিন এগিয়ে আসছে বলে হঠাৎ করে প্রতিদিনের অনুশীলনের মাত্রা বা মাইল বাড়িয়ে দেবেন না। শরীরকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিন।
স্ট্রেংথ ট্রেনিং, মোবিলিটি এবং রিকভারির গুরুত্ব
শ্বেতা জানিয়েছেন, অনেকেই ভাবেন প্রতিদিন দীর্ঘ পথ দৌড়ালেই ম্যারাথনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। দৌড়ের পাশাপাশি স্ট্রেংথ ট্রেনিং এবং শরীরের নমনীয়তা বা মোবিলিটির জন্য ব্যায়াম করা অত্যন্ত জরুরি।
১) ইনজুরি প্রতিরোধ: স্ট্রেংথ ট্রেনিং পায়ের পেশি এবং জয়েন্টকে শক্তিশালী করে, যা দৌড়ানোর সময় পায়ের ওপর বারবার আসা প্রভাব (Impact) সহ্য করতে সাহায্য করে।
২) সঠিক ফর্ম বজায় রাখা: ক্লান্ত অবস্থায়ও শরীরের রানিং মেকানিক্স ঠিক রাখতে শক্তি সহায়ক হয়।
৩) রিকভারিই আসল ট্রেনিং: কোচ শ্বেতা স্পষ্ট জানান, “রিকভারি মানে নষ্ট হওয়া সময় নয়, এটি প্রশিক্ষণেরই একটি অংশ।” প্রতিদিন কঠিন প্রশিক্ষণ না নিয়ে ইজি রান, লং রান এবং স্পিড সেশনকে সঠিকভাবে সাজাতে হবে।
ডায়েট, ফুয়েলিং এবং হাইড্রেশন টিপস শ্বেতরা
১) সহজ ও সুষম খাদ্য তালিকা: প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, হেলদি ফ্যাট, সতেজ ফলমূল ও শাকসবজি থাকা আবশ্যক।
২) আগে থেকে পরীক্ষা করুন: সবচেয়ে বড় ভুল হলো রেসের দিন নতুন কোনো খাবার বা এনার্জি জেল ট্রাই করা। অনুশীলনের সময়ই জল, ইলেকট্রোলাইট এবং ফুয়েলিং স্ট্র্যাটেজি টেস্ট করে নিন।
৩) কখনই না খেয়ে দৌড়াবেন না: শারীরিক অনুশীলনের পর শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টি দিন, যাতে পেশি দ্রুত নতুন করে শক্তিসঞ্চয় করতে পারে।
মানসিক দৃঢ়তা এবং সংকেত চেনা
শ্বেতার মতে, দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে শরীর ক্লান্ত হওয়ার আগে মন হাল ছেড়ে দেয়। তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত জরুরি -
১) বড় দূরত্বকে ছোট ছোট সেকশনে ভাগ করে নিন।
২) জটিল মুহূর্তে নিঃশ্বাসের ছন্দ, দৌড়ের ফর্ম এবং পেসের দিকে মনোযোগ দিন।
৩) একটি বাস্তবসম্মত রেস প্ল্যান তৈরি করুন এবং তা মেনে চলুন।
৪) একইসঙ্গে শরীরের সংকেত বোঝা অত্যন্ত জরুরি। একটানা অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পেশিতে তীব্র যন্ত্রণা বা চলাফেরায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা করবেন না। জয়ের মূল চাবিকাঠি হলো স্মার্টভাবে ট্রেন করা, শরীরের সীমাবদ্ধতাকে শ্রদ্ধা জানানো এবং নিজের প্রস্তুতির ওপর বিশ্বাস রাখা।
মহিলা দৌড়বিদদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
শ্বেতা জানিয়েছেন, মহিলা অ্যাথলিটদের জন্য ব্যক্তিগত সক্ষমতা অনুযায়ী কাস্টমাইজড অনুশীলনের ওপর জোর দিয়েছেন শ্বেতা লাখওয়ানি। মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল, আয়রনের মাত্রা, ঘুমের গুণমান এবং মানসিক চাপের প্রভাব দৌড়ের ওপর পড়তে পারে। তাই নিজের ক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেও শরীরের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিজস্ব শরীর, অভিজ্ঞতা ও লক্ষ্য বুঝে স্ট্রেংথ ট্রেনিংকে জীবনের অঙ্গ করে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
রেসের দিনের গোল্ডেন রুলস
তাঁর মতে, রেসের দিন সকালে স্টার্ট লাইনে দাঁড়িয়ে অন্য কোনও দৌড়বিদের গতি বা পেস দেখে উত্তেজিত হওয়া যাবে না। শান্ত থেকে নিজের অনুশীলন করা পেসেই দৌড় শুরু করুন। যে ফুয়েলিং ও হাইড্রেশন প্ল্যান আপনি এতদিন ধরে ট্রাই করেছেন, ঠিক সেটাই ব্যবহার করুন। রেসের মাঝামাঝি বা শেষ পর্বে যদি শরীর অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হয়, তবেই ধীরে ধীরে নিজের প্রচেষ্টা বা গতি বাড়ান।
শ্বেতা লাখওয়ানির তিন মূল মন্ত্র
১) ধারাবাহিকতা
২) কঠিনের বদলে বুদ্ধিমানের মতো ট্রেনিং করুন
৩) নিজের শরীরকে সম্মান জানান ও প্রস্তুতিতে ভরসা রাখুন