নিয়ম মানা হয়নি। অগ্নিনিরাপত্তার নির্দেশিকাও কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ। পুরসভা, দমকল এবং বিদ্যুৎ সংস্থার অনুমতি ঘিরেও উঠেছে একের পর এক প্রশ্ন। আর তার মধ্যেই কলকাতার নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে ভয়াবহ আগুনে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের।

বুধবার ভোররাতে হোটেল ‘শিখাহীন’-এ আগুন লাগে। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, এসি-র শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। রাত প্রায় আড়াইটে নাগাদ আগুন লাগে। তখন অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে ধোঁয়ায় ভরে যায় হোটেলের ঘর।
উদ্ধারকারী দলের কাছে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভবনের কাঠামো। মাত্র পাঁচ ফুটের মতো সরু প্রবেশপথ। দু’পাশে কলাপসিবল গেট। ভিতরে একটি ভবনের মধ্যেই একাধিক হোটেল। মোট ছ’টি হোটেলের বোর্ড ঝুলতে দেখা গিয়েছে। ঘরের ভিতর আবার ঘর। কোথাও সরু করিডর। কোথাও খুপরির মতো ছোট ঘর।
পাঁচতলা ভবনের সিঁড়িও ছিল সরু ও বেঁকে যাওয়া। একসঙ্গে দু’জন চলাচল করাও কঠিন বলে অভিযোগ। কোনও ফায়ার এক্সিট ছিল না। বাইরে থেকে উদ্ধার করার মতো বিকল্প সিঁড়িও ছিল না। ফলে আগুন লাগার পর ভিতরে আটকে পড়া অতিথিদের দ্রুত বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি দেখেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি ভবনের মধ্যে এতগুলি হোটেল কী ভাবে চলত? এতগুলি এসি বসানোর অনুমতি কী ভাবে দেওয়া হয়েছিল? কলকাতা পুরসভা ট্রেড লাইসেন্সই বা কী ভাবে পাশ করল?
{{/usCountry}}এই পরিস্থিতি দেখেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বুধবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি ভবনের মধ্যে এতগুলি হোটেল কী ভাবে চলত? এতগুলি এসি বসানোর অনুমতি কী ভাবে দেওয়া হয়েছিল? কলকাতা পুরসভা ট্রেড লাইসেন্সই বা কী ভাবে পাশ করল?
{{/usCountry}}বিদ্যুৎ সংস্থা সিইএসসির অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, এতগুলি এসি চললেও বেনিয়ম আগে ধরা পড়ল না কেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তৃণমূল সরকারের আমলে এই ধরনের হোটেল কী ভাবে অনুমতি পেল, তা নিয়েও তদন্তের দাবি তুলেছেন তিনি।
ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীও। তিনিও হোটেলগুলির অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, একই ভবনের প্রতিটি তলায় ছোট ছোট হোটেল চালানোর ব্যবস্থা ছিল। অথচ বিপদের সময় মানুষ বেরোনোর মতো যথেষ্ট জায়গাই নেই।
কৌশিকের বক্তব্য, এই ধরনের হোটেলের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তাঁর কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর ফের সামনে এসেছে কলকাতার পুরনো ও ঘিঞ্জি এলাকার হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন। নিউ মার্কেট, ধর্মতলা, চাঁদনি চক, জোড়াসাঁকোর মতো এলাকায় বহু পুরনো বাড়ির ভিতর তৈরি হয়েছে ছোট ছোট হোটেল। অনেক ক্ষেত্রে কাঠামো বদলে সানমাইকা, প্লাইউড এবং অন্যান্য দাহ্য সামগ্রী দিয়ে ঘর সাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
কিন্তু নিয়ম মেনে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল কি না, বিপদের সময় বেরোনোর পথ ছিল কি না, তা নিয়ে নজরদারি কতটা হয়েছে, এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কয়েক বছর আগে কলকাতার জোড়াসাঁকোর একটি হোটেলে আগুনের পর অডিট কমিটি গড়া হয়েছিল। পুরসভায় চারটি বৈঠকও হয়েছিল। শহরের হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পুরসভা সূত্রের খবর, সেই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল দমকলের হাতে ছিল না। তাই থার্ড পার্টি অডিটের পরিকল্পনা করা হয়। শহরে প্রায় ৩৭৮৮টি এমন হোটেল চিহ্নিত হলেও মাত্র ১৫ থেকে ২০টি হোটেলের অডিট করা সম্ভব হয়েছিল বলে দাবি।
এর পর কাজ আর এগোয়নি। অডিট রিপোর্টও পুরসভা বা দমকলের কাছে জমা পড়েনি বলে অভিযোগ। চারটি বৈঠকের পর আর বৈঠক হয়নি।
এই ব্যর্থতার দায় কার? প্রশ্ন উঠছে। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম অবশ্য বলেছেন, দমকলের লোকবল কম থাকায় থার্ড পার্টি অডিটের কথা বলা হয়েছিল। ট্রেড লাইসেন্সের নজরদারি তাঁর দফতরের দায়িত্ব নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তারাপীঠের হোটেলে আগুনে ৯ জনের মৃত্যুর পর কয়েক দিনের মধ্যেই কলকাতায় আরও ৯ প্রাণহানি। দুই ঘটনাতেই সামনে এসেছে প্রায় একই ছবি—ঘিঞ্জি হোটেল, সীমিত বেরোনোর পথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
এখন তদন্তে স্পষ্ট হতে হবে, নিয়ম ভেঙে এই হোটেলগুলি কী ভাবে চলছিল। কে অনুমতি দিয়েছিল? কেন নজরদারি হয়নি? এবং সময় থাকতে ব্যবস্থা নেওয়া গেল না কেন? ৯ জনের মৃত্যুর পর এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।