Reasons behind extinction of indigenous fish Bengal: গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেঠো পুকুর, ডোবা, নিচু ধানি জমি আর বিলের জল যখন হেমন্তের শেষে কমতে শুরু করত, তখন গাঁয়ের হাটে কিংবা মাটির রান্নাঘরে সবচেয়ে পরিচিত একটা নাম ছিল চ্যাং মাছ। লম্বাটে গড়ন, গায়ের ওপর ফোটা ফোটা ডোরাকাটা দাগ আর চরম প্রতিকূল পরিবেশেও অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকার অদম্য ক্ষমতা—এই ছিল প্রথাগত চ্যাং মাছের পরিচয়। টাকি বা শোল মাছের মতো একই পরিবারের সদস্য হলেও স্বাদ, পুষ্টিগুণ আর উপযোগিতার দিক থেকে চ্যাং মাছের স্থান ছিল বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে অত্যন্ত স্বতন্ত্র।

কিন্তু কালক্রমে আজ গ্রামীণ জলাশয়গুলো থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী জিওল মাছ। আজকের শহরের চকচকে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা হাইব্রিড পাঙ্গাস-তেলাপিয়ায় ঠাসা মাছের বাজারে চ্যাং মাছের দেখা মেলা দুষ্কর। কোথায় হারিয়ে গেল গ্রামীণ রূপকথার এই চ্যাং মাছ? কীভাবেই বা বাংলার লোকাচার ও রান্নাঘরের স্মৃতিতে আটকে রইল এই সুস্বাদু মাছ?
১. বাঙালি সংস্কৃতি ও লোকজীবনের সঙ্গে চ্যাং মাছের গভীর সম্পর্ক
বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও লোকজ ঐতিহ্যে চ্যাং মাছ কেবল একটি খাবারের পদ ছিল না, এটি ছিল পল্লিবাংলার অন্যতম সামাজিক অনুষঙ্গ:
- ভেষজ গুণ ও কবিরাজি চিকিৎসা: গ্রাম বাংলায় চ্যাং মাছকে কেবল সুস্বাদু পদ হিসেবে দেখা হতো না, এটি ছিল প্রাকৃতিক পথ্য। প্রসূতি মা, অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা শারীরিক দুর্বলতায় ভোগা মানুষকে শক্তি ফেরাতে চ্যাং মাছের পাতলা ঝোল ও জ্যান্ত কাঁচা ঝোল খাওয়ানোর চল ছিল। কাঁচকলা, পেঁপে আর গোলমরিচ দিয়ে রাঁধা চ্যাং মাছের ঝোল পেট ঠাণ্ডা রাখা ও রক্ত পরিষ্কার করার মহাঔষধ বলে মানা হতো।
- অনন্য রান্নার রূপকথা: চ্যাং মাছ পোড়া কিংবা সর্ষে-বাটা দিয়ে মাখা পোড়া মাখা প্রবীণ বাঙালিদের স্মৃতির পাতায় আজও অমলিন। শীতের মুখে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ডোবার জল ছেঁকে কাদার ভেতর থেকে জ্যান্ত চ্যাং মাছ ধরে আনত। তারপর খড়কুটো জ্বালিয়ে সেই আগুনের ছাইয়ে মাছ সেঁকে নিয়ে সর্ষের তেল, কাঁচা লঙ্কা ও পেঁয়াজ দিয়ে মাখার সেই স্বাদ ছিল অতুলনীয়।
- ছড়া ও প্রবাদে স্থান: গ্রামীণ কথাশিল্প, প্রবাদ-প্রবচন ও লোকছড়াতেও চ্যাং মাছের উল্লেখ দেখা যেত। কাদার ভেতর লুকিয়ে থাকা কিংবা সোজা হয়ে সাঁতার কাটার ভঙ্গি নিয়ে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপক উদাহরণে চ্যাং মাছকে স্মরণ করতেন।
২. কীভাবে এবং কেন প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেল চ্যাং মাছ?
বিজ্ঞানীদের মতে চ্যাং মাছ একটি শক্তপ্রাণ প্রজাতি, যা প্রতিকূল পরিবেশ ও স্বল্প অক্সিজেনেও কাদার নিচে বেঁচে থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে এর আশঙ্কাজনক বিলুপ্তির পেছনে বেশ কিছু মানবসৃষ্ট ও পরিবেশগত কারণ দায়ী:
- রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার: ইরি ধান চাষ এবং আধুনিক কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশক, রাসায়নিক সার ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে চাষের জমির জল বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ধানি জমির অগভীর জলে ডিম পাড়া চ্যাং মাছের পোনা ও মা-মাছ এই রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মারা যায়।
- প্রাকৃতিক জলাশয় ও ডোবা ভরাট: গ্রামবাংলায় দিন দিন জলাশয়, ডোবা, ছোট বিল ও নালা ভরাট করে আবাসন বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠছে। চ্যাং মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এদের প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট হয়েছে।
- কৃত্রিম সেচ ও সেঁচে মাছ ধরা: শীতের মৌসুমে ছোট ছোট ডোবা ও নালা সম্পূর্ণ সেঁচে ছাঁকনি ও কারেন্ট জাল দিয়ে মা-মাছ ধরে ফেলার ফলে প্রাকৃতিকভাবে চ্যাং মাছের বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে।
- বাণিজ্যিক চাষে অবহেলা: রুই, কাতলা, পাঙ্গাস বা তেলাপিয়ার মতো বাণিজ্যিক মাছের দ্রুত বৃদ্ধি হলেও চ্যাং মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক চাষের উদ্যোগ সেভাবে নেওয়া হয়নি। ফলে বাণিজ্যিক মাছের দাপটে খাঁটি দেশি প্রজাতির চ্যাং মাছ কোণঠাসা হয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।
৩. অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই: ঐতিহ্য কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
{{/usCountry}}বিজ্ঞানীদের মতে চ্যাং মাছ একটি শক্তপ্রাণ প্রজাতি, যা প্রতিকূল পরিবেশ ও স্বল্প অক্সিজেনেও কাদার নিচে বেঁচে থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে এর আশঙ্কাজনক বিলুপ্তির পেছনে বেশ কিছু মানবসৃষ্ট ও পরিবেশগত কারণ দায়ী:
- রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার: ইরি ধান চাষ এবং আধুনিক কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশক, রাসায়নিক সার ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে চাষের জমির জল বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ধানি জমির অগভীর জলে ডিম পাড়া চ্যাং মাছের পোনা ও মা-মাছ এই রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মারা যায়।
- প্রাকৃতিক জলাশয় ও ডোবা ভরাট: গ্রামবাংলায় দিন দিন জলাশয়, ডোবা, ছোট বিল ও নালা ভরাট করে আবাসন বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠছে। চ্যাং মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এদের প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট হয়েছে।
- কৃত্রিম সেচ ও সেঁচে মাছ ধরা: শীতের মৌসুমে ছোট ছোট ডোবা ও নালা সম্পূর্ণ সেঁচে ছাঁকনি ও কারেন্ট জাল দিয়ে মা-মাছ ধরে ফেলার ফলে প্রাকৃতিকভাবে চ্যাং মাছের বংশবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে।
- বাণিজ্যিক চাষে অবহেলা: রুই, কাতলা, পাঙ্গাস বা তেলাপিয়ার মতো বাণিজ্যিক মাছের দ্রুত বৃদ্ধি হলেও চ্যাং মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও বাণিজ্যিক চাষের উদ্যোগ সেভাবে নেওয়া হয়নি। ফলে বাণিজ্যিক মাছের দাপটে খাঁটি দেশি প্রজাতির চ্যাং মাছ কোণঠাসা হয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।
৩. অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই: ঐতিহ্য কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
{{/usCountry}}চ্যাং মাছের মতো বিলুপ্তপ্রায় দেশি প্রজাতি রক্ষা করা কেবল স্বাদ ধরে রাখার বিষয় নয়, এটি আমাদের দেশীয় জীববৈচিত্র্য ও লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। মৎস্য বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয়ে কীটনাশকের প্রভাব কমানো, বর্ষাকালে প্রজননের মৌসুমে ছোট মাছ ধরা বন্ধ করা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশি জিওল মাছের চাষ বাড়ানো গেলে হয়তো আবারও বাঙালির হেঁসেলে ফিরতে পারে ঐতিহ্যবাহী চ্যাং মাছের পোড়া ও ঝোল।
আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, মাটির স্বাদ ও পুষ্টির সমৃদ্ধ ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে চ্যাং মাছের অস্তিত্বের সাথে। কাদার নিচে লুকিয়ে থাকা এই ছোট জ্যান্ত মাছটিকে হারিয়ে যেতে না দিয়ে আমাদের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।