দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ এবং নৃশংসভাবে খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফুঁসছে গোটা রাজ্য। আর এই নারকীয় অপরাধ এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতার আস্ফালন দেখে নিজের ক্ষোভ ও হতাশা উগরে দিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ঋদ্ধি সেন (Riddhi Sen)। সমাজমাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও ঝাঁঝালো পোস্ট লিখে ঋদ্ধি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, কীভাবে আজকের সমাজে অপরাধের চেয়ে ‘অপরাধের পেছনের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড’ মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান ভারতের ‘সিলেকটিভ এথিক্স’ বা বেছে বেছে নীতিপুলিশি করার মানসিকতা এবং সংবাদমাধ্যমের অমানবিকতাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন অভিনেতা।
‘আসল কথা হলো, আপনি কোন ব্র্যান্ডের বদল কিনছেন!’
ঋদ্ধি তাঁর লেখার শুরুতেই ‘বদল’ শব্দটির অসারতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, ‘বদল’ শব্দটা ফেসবুকের দেওয়ালে বা বিজ্ঞাপনে দেখতে ভালো লাগলেও, বর্তমান ভারতবর্ষের বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে রাজনৈতিক বদল আসলে একটি সুকৌশলে বেচে দেওয়া বিজ্ঞাপন মাত্র।
আজকের সমাজের দ্বিচারিতা নিয়ে ঋদ্ধি লেখেন. ‘আপনার পছন্দের ব্র্যান্ডের স্পনসর করা দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ হলে সেটা ‘চাঙ্গা সি’ আর অপছন্দের ব্র্যান্ডের স্পনসর করা হলেই সেটা দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণের একমাত্র নিদর্শন, কারণ আসলে সবটাই সিলেকটিভ। অপরাধকে স্রেফ অপরাধ হিসেবে দেখার আগে অপরাধের পেছনের ব্র্যান্ডটা আমাদের কাছে এখন অনেক বেশি জরুরী হয়ে গেছে।’
বারুইপুরের নৃশংসতা ও ক্ষমতার আস্ফালন
বারুইপুরের সেই ১১ বছরের নাবালিকার ওপর হওয়া নারকীয় অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে উঠেছেন অভিনেতা। বস্তাবন্দি সেই ছোট্ট মৃতদেহ উদ্ধার এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করে ঋদ্ধি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি স্থানীয় বিজেপি নেতার ক্ষমতার দাপটে সন্দেহভাজনদের পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টার সমালোচনা করে জানান, এই অকল্পনীয় ক্ষোভ ও রাগ থেকেই জনরোষ তৈরি হয়। অথচ, সাধারণ মানুষ এই বাস্তব যন্ত্রণা থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু ‘হকার মুক্ত রাস্তা আর চকচকে উন্নয়ন’ কল্পনা করতেই ব্যস্ত।
ঋদ্ধির কথায়, আইনি বা রাজনৈতিক— যে পথেই হোক, অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা যে সমাজ করে, সেখানে সাধারণ মানুষের ‘অবাক’ হওয়ার অনুভূতিটাই আসলে অবান্তর।
{{/usCountry}}ঋদ্ধির কথায়, আইনি বা রাজনৈতিক— যে পথেই হোক, অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা যে সমাজ করে, সেখানে সাধারণ মানুষের ‘অবাক’ হওয়ার অনুভূতিটাই আসলে অবান্তর।
{{/usCountry}}প্রাইম টাইম স্লটে ‘শিশুর শবদেহকে আরও একবার খুন’
তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে ঋদ্ধি আক্রমণ করেছেন বর্তমান সময়ের একদল ঘোষিত ও অঘোষিত সংবাদমাধ্যমকে। তিনি অভিযোগ করেন, টাকার বিনিময়ে প্রাইম টাইম স্লটে এই মৃত কিশোরিকে কেন্দ্র করে যে ধরনের সংবেদনহীন চর্চা চলে, তা আসলে ওই নাবালিকাকে সমাজ তথা পর্দার সামনে ‘আরও একবার খুন’ করার শামিল।
ঋদ্ধির কথায়, ‘বিচার হবে,গ্রেফতার হবে,শাস্তি হবে,নিশ্চই হবে l কিন্তু যে সমাজে এখনো এক ১১ বছরের শিশুকে গণধর্ষণ করে গলায় পা তুলে হত্যা করা হয়,সেই ঘটনার সাথে যুক্ত সন্দেহভাজনদের ছাড়িয়ে আনার দায়িত্ব আইনি পথে না হয় রাজনৈতিক ক্ষমতার পথে হয়,বর্তমান সরকারের ঘোষিত এবং অঘোষিত সংবাদ মাধ্যমের দল টাকার বিনিময়ে শিশুর শব্দেহকে কেন্দ্র করে প্রাইম টাইমে স্লটে শিশুটিকে আরো একবার খুন করে,সেই সমাজে আমাদের অবাক হওয়া আর আশ্চর্যগুলো পুকুরের জলে ফেলে আসুন বা প্রয়াত শিশুটির শবদেহের পাশে রেখে আসুন l কারণ আমরা সবাই জানি যে বিচার পাওয়ার আগের আর পরের সমাজের চেহারাটা একই থেকে যায় এবং যাবে l’
উন্নয়নের ফাঁপা বুলি এবং অন্ধত্বকে কটাক্ষ করে পোস্টের শেষে ঋদ্ধি লেখেন:
‘যারা মনে করেন এই পৃথিবীতে, এই সমাজে সত্যিই উন্নয়ন হতে পারে তারাই সুখে থাকবেন এই পৃথিবীতে, অন্ধত্ব সাময়িক সুখ আনে বৈকি। সুতরাং চিন্তা নেই, ‘ভয় আউট ভরসা ইন’, পুরোনো ভয় থাকুক এবার নতুন রাস্তায় আর ভরসা থাকুক আপনার ঘুমে।’
বিচার হয়তো একসময় হবে, কিন্তু বিচার পাওয়ার আগেও সমাজ যা ছিল, পরেও তাই থেকে যাবে— এই চরম ও নির্মম বাস্তবকে সামনে রেখেই বারুইপুর কাণ্ডে নিজের প্রতিবাদের ভাষা ও নিদারুণ দুঃখ প্রকাশ করলেন ঋদ্ধি সেন।