ইছামতী নদীর এক পাড়ে বাংলাদেশ, আর অন্য পাড়ে ভারত। যে নদীর দুই পাড় বিভাজনের গল্প বলে, সেখানেই সিনেমার শুটিংয়ে গিয়ে হঠাৎ নিজের অতীত ও শেকড়ের স্মৃতিতে ডুব দিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী শিরিন পাল। গত ১৯ সেপ্টেম্বর টাকি পৌঁছানোর পর ইছামতীর শান্ত রূপ আর দুই দেশের সীমানা দেখে নিজের ফেসবুক পাতায় এক দীর্ঘ আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী খোলা চিঠি লিখেছেন তিনি।

দেশভাগের ক্ষত, আম্মার (ঠাকুমা) ফেলে আসা বেনারসি শাড়ি, ভয়ের ইতিহাস আর দুই দেশের একই মেঘ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির গল্পে ভেসেছে তাঁর এই অনুভূতি।
‘পাকস্থলিতে ইসলাম নেই, নেই কো হিন্দুয়ানি!’
টাকিতে শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা জানিয়ে শিরিন লেখেন, ইছামতীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নয়-দশ বার গাওয়া আর শোনা গানটির কথা— ‘পাকস্থলিতে ইসলাম নেই, নেই কো হিন্দুয়ানি... তাতে যাহা জল, তাহা পানি!’
আম্মার স্মৃতি মনে পড়লেই তাঁর চোখে ভেসে ওঠে চুন খসা দেওয়ালে কুঁজো পিঠ ঠেকিয়ে একা একা গান গেয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধার ছবি। মায়ের কাছে সযত্নে তুলে রাখা ঠাকুমার হাতের লেখা গানের খাতা আর সেই খাতা থেকে মায়ের গলায় শোনা সুরগুলোর কথা স্মরণ করেছেন তিনি।
দেশভাগের যন্ত্রণা ও সাদা থানের আড়ালে চাপা পড়া অতীত:
মায়ের কাছে আম্মার গল্প শুনে বড় হওয়া শিরিনের মনে গভীর রেখাপাত করেছে ওপাড় বাংলা থেকে এপাড়ে আসার ইতিহাস। তিনি লিখেছেন, 'মায়ের কাছে গল্প শুনেছি আম্মার দেশ ছেড়ে রাষ্ট্রে আসার। আম্মার সোনার মিনে করা বেনারসি ফেলে সাদা থান গায়ে তোলার। আম্মার গান গাওয়ার, ভয়ের ইতিহাস, খিদের ইতিহাস... আম্মার 'পানি কেটে জল আর জল কেটে পানি' অভ্যাসের গল্প।'
‘তোমার দ্যাশেও যেই আকাশ দিয়ে বৃষ্টি ঝরে, আমার দেশেও সেই আকাশ থেকেই বৃষ্টি নামে…’
{{/usCountry}}‘তোমার দ্যাশেও যেই আকাশ দিয়ে বৃষ্টি ঝরে, আমার দেশেও সেই আকাশ থেকেই বৃষ্টি নামে…’
{{/usCountry}}২০ সেপ্টেম্বর ভোরে উঠে ইছামতীর ছবি মা-বাবাকে পাঠানোর পর হঠাৎই ইছামতীর ওপারে মুষলধারে বৃষ্টি নামতে দেখেন শিরিন। সেই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, যেন আম্মার সেই ঝুলে যাওয়া চামড়ার সরু হাত দুটো মুঠো ভরে ইছামতীর জল নিয়ে গায়ে মাখছে!
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই কালো মেঘ ইছামতী পেরিয়ে এপারের আকাশেও নেমে আসে এবং মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। শুটিং কিছুটা ব্যাহত হলেও শিরিনের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এক অদ্ভুত অনুভূতি। আম্মাকে উদ্দেশ্যে করে তিনি লেখেন— 'আম্মা জানো, তোমার দ্যাশেও যেই আকাশ দিয়া বৃষ্টি ঝরে, আমার দেশেও সেই আকাশ থেকেই বৃষ্টি নামে। যাহা জল, তা-ই আমার খ্যাত!'
সীমানা আর রাজনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে শিরিন পালের এই অনুভূতি প্রমাণ করে দিল— স্মৃতি আর রক্তের টানে কোনো নদীর বিভাজনই শেষ কথা হতে পারে না!