...
...
Next Story

‘আমার পরান যাহা চায়’—প্রেম নাকি ভক্তির আকুলতা? জানুন রবীন্দ্রনাথের এই অমর সৃষ্টির ইতিহাস ও গানের কথা

এই গানটি কখন রচিত হয়েছিল? কার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ এই সুরের আকুলতা ঢেলে দিয়েছিলেন? এটি কি কোনো পার্থিব প্রেমের গান, নাকি পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তির ব্যাকুলতা?

Published on: Aug 18, 2026, 10:51:22 IST
Advertisement

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান মানেই মানুষের অন্তরের সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলোর এক পরম প্রকাশ। বিরহ, প্রেম, প্রেমিকের প্রতি আত্মনিবেদন কিংবা পরমাত্মার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ—রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতিটি সুর যেন আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। আর কবিগুরুর সেইসব কালজয়ী সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ও চিরসবুজ প্রেম ও ভক্তির গান হলো ‘আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো’।

‘আমার পরাণ যাহা চায়’—প্রেম নাকি ভক্তির আকুলতা? জানুন ইতিহাস ও গানের কথা
‘আমার পরাণ যাহা চায়’—প্রেম নাকি ভক্তির আকুলতা? জানুন ইতিহাস ও গানের কথা

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইমন-কল্যাণ রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত এই গানটি যুগে যুগে কোটি কোটি সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয় দোলা দিয়ে আসছে। তবে এই গানটি কখন রচিত হয়েছিল? কার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ এই সুরের আকুলতা ঢেলে দিয়েছিলেন? এটি কি কোনো পার্থিব প্রেমের গান, নাকি পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তির ব্যাকুলতা? ‘আমার পরান যাহা চায়’ গানের পেছনের ইতিহাস, এর গভীর ভাবার্থ এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের ধারায় এর অতুলনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো।

১. সৃষ্টির পেছনের কাহিনি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রসঙ্গীতের শ্রেণিবিভাগে ‘আমার পরান যাহা চায়’ গানটিকে প্রধানত ‘প্রেম’ (Love) পর্যায়ের গান হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এর মধ্যে প্রেম ও ভক্তির এক অপূর্ব আত্মিক মেলবন্ধন রয়েছে।

রচনাকাল ও স্বরলিপি: গানটি ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে (১২৯৫ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন। তৎকালীন শিলাইদহ ও কলকাতার পারিবারিক দিনগুলোর কাব্যিক পরিবেশে গানটি আত্মপ্রকাশ করে। গানটির সুরকার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এবং পরবর্তীতে এর স্বরলিপি প্রস্তুত করেন কাঙ্গালীচরণ সেন। ‘কাব্যগ্রন্থ’ এবং রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী গান-সংকলন ‘গীতবিতান’-এর প্রেম পর্যায়ভুক্ত ‘প্রেম বৈচিত্র’ উপপর্যায়ে এই গানটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মানবিক প্রেম থেকে ঐশ্বরিক ভাব: রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে পার্থিব প্রেমিক বা প্রেমিকা এবং অপার্থিব পরমাত্মা এক সুতোয় গেঁথে যান। ‘আমার পরান যাহা চায়’ গানে যে আত্মনিবেদনের সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা একদিকে যেমন কোনো প্রিয়জনের প্রতি চিরন্তন ভালোবাসার স্বীকারোক্তি, তেমনই অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে তা পরমেশ্বরের চরণে ভক্তের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

২. গানের কথা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটির সূচনাতেই ধরা পড়ে হৃদয়ের পরম আকুলতা ও ভালোবাসার অনন্য অভিব্যক্তি:

আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো।

তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই কিছু নাই গো॥

তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও--

আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে, আর কিছু নাহি চাই গো॥

আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস,

দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।

যদি আর-কারে ভালোবাস, যদি আর ফিরে নাহি আস,

তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো॥

৩. গানের কাব্যিক ভাবার্থ ও দর্শন

এই গানটির প্রতিটি চরণে কবি নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার আনন্দ খুঁজে পেয়েছেন। সাধারণ প্রেমে যেখানে পাওয়ার আশা বা চাওয়া-পাওয়ার হিসেব থাকে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই সৃষ্টিতে পাওয়া যায় প্রতিদানের আশা না রেখে কেবল ভালোবাসার এক মহান বার্তা।

কবি বলছেন, প্রিয়জন যদি তাঁর নিজের সুখ নাও চায়, সে যদি কেবল হাসিতেই আনন্দ পায়, তবে দূর থেকে সেই হাসি দেখেই প্রেমিক নিজের অশ্রু বিসর্জন দিতে রাজি। অর্থাৎ, ভালোবাসায় নিজের কোনো দাবি বা অহংকার নেই; প্রিয়জনের আনন্দই যেখানে একমাত্র প্রাপ্তি। এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই গানটিকে পৃথিবীর সমস্ত প্রেমের গানের থেকে এক আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথের ‘আমার পরান যাহা চায়’ কেবল একটি গান নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের এক চিরন্তন অনুভূতি। শতবর্ষ পেরিয়েও আজ যখনই ভালোবাসার গভীরতা মাপার প্রসঙ্গ আসে, তখনই মানুষের মুখে গুঞ্জরিত হয় এই গান।

 
SHARE THIS ARTICLE ON
Hindustantimes wants to start sending you push notifications. Click allow to subscribe