বাংলা নাট্যজগতের কিংবদন্তি নাট্যকার বাদল সরকারের অন্যতম কালজয়ী নাটক 'পাগলা ঘোড়া' এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে উড়িয়ে দিল জয়ের পতাকা! বিখ্যাত পরিচালক শেখর দাশের পরিচালনায় তৈরি এই নাটক ভিত্তিক চলচ্চিত্রটি নির্বাচিত হয়েছে প্যারিসের সম্মানজনক 'গাঙ্গে সুর সেইন ফেস্টিভ্যাল' (Gange sur Seine Festival)-এ। শুধু তা-ই নয়, ঐতিহ্যবাহী 'ক্লব দ্যু লেতোয়াল' (Club de l'Étoile)-এ উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র (Opening Film) হিসেবে প্রদর্শিত হতে চলেছে ছবিটি!

বাদল সরকারের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের বছরে বিশ্বমঞ্চে এই ধরনের ঐতিহাসিক সম্মান অর্জন বাংলা সিনেমা ও থিয়েটার জগতের জন্য এক অভাবনীয় গর্বের মুহূর্ত।
তারকাখচিত কাস্ট ও আন্তর্জাতিক সম্মান:
গভীর রাতে শ্মশানের পটভূমিতে তৈরি এই মনস্তাত্ত্বিক গল্পে সমাজ, পুরুষতন্ত্র এবং অবদমিত অনুভূতির নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন পরিচালক শেখর দাশ। ছবিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন গার্গী রায়চৌধুরী, রজতাভ দত্ত, সুজন মুখোপাধ্যায়, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, জয়ন্ত হোর, সৃজিতা সাহা ও দীর্ঘয়ী পাল। ছবিটির প্রযোজনা করেছেন ড. প্রবীর ভৌমিক এবং সংগীতে রয়েছেন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত।
‘পাগলা ঘোড়া বহুদূর ছুটে এসেছে!’— আবেগঘন তারকারা:
আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত পুরো টিম!
পরিচালকের কথায়, 'এটি নিছক আর একটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনী নয়। বরং আমার কাছে এটি অনেকটা ঘরে ফেরার মতো অনুভূতি। ছবিটি প্রখ্যাত নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা ও তৃতীয় থিয়েটারের প্রবক্তা বাদল সরকারের কালজয়ী নাটক পাগলা ঘোড়ার উপর ভিত্তি করে নির্মিত। আর তাঁর জন্মশতবর্ষের বছরে প্যারিসে ছবিটির প্রদর্শনী তাই একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
প্যারিসের একেবারে হৃদয়ে অবস্থিত Club de l’Étoile-কে এই প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে বেছে নেওয়ায় উপলক্ষটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে ছবিটি শুধু বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছেই নয়, ফরাসি দর্শক, চলচ্চিত্রপ্রেমী, শিল্পী এবং ভারতীয় থিয়েটার ও সিনেমার প্রতি আগ্রহী বৃহত্তর দর্শকের কাছেও পৌঁছনোর সুযোগ পাচ্ছে।'
{{/usCountry}}প্যারিসের একেবারে হৃদয়ে অবস্থিত Club de l’Étoile-কে এই প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে বেছে নেওয়ায় উপলক্ষটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে ছবিটি শুধু বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছেই নয়, ফরাসি দর্শক, চলচ্চিত্রপ্রেমী, শিল্পী এবং ভারতীয় থিয়েটার ও সিনেমার প্রতি আগ্রহী বৃহত্তর দর্শকের কাছেও পৌঁছনোর সুযোগ পাচ্ছে।'
{{/usCountry}}প্রবীণ অভিনেতা রজতাভ দত্ত নিজের আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, ‘পাগলা ঘোড়া বহু দূর ছুটে এসেছে। আর এবার সেই ছুটে চলা পেরিয়ে গেল আন্তর্জাতিক সীমানা। এটি আমাদের প্রত্যেকের কাছেই এক বিরাট সম্মান ও গভীর আবেগের মুহূর্ত।’
অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী জানান, প্রোসেনিয়াম মঞ্চের নাটকীয় সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে কীভাবে শেখর দাশ গল্পটিকে চমৎকার সিনেম্যাটিক রূপ দিয়েছেন, তা সততই প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, ‘পাগলা ঘোড়া এমন একটি ছবি, যার মধ্যে বহমান রয়েছে বাদল সরকারের অসামান্য সৃষ্টির উত্তরাধিকার। একই সঙ্গে এটি এমন কিছু গভীর মানবিক অনুভূতি, সম্পর্ক ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা বলে, যা সময়, প্রজন্ম কিংবা সংস্কৃতির সীমারেখায় আটকে থাকে না। পাগলা ঘোড়া মূলত প্রোসেনিয়াম মঞ্চের জন্য লেখা। তার নিজস্ব নাট্যভাষা, নাটকীয় সম্ভাবনা এবং মঞ্চের কিছু স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু এই ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে আমার কাছে বিশেষ করে তুলেছিলেন পরিচালক শেখর দাশ। তিনি আমাকে চরিত্র বা গল্পটিকে শুধুমাত্র মঞ্চনাটকের পরিসরে ভাবতে দেননি। বরং বারবার উৎসাহ দিয়েছেন প্রোসেনিয়ামের সীমা পেরিয়ে ভাবতে, এবং এই গল্পকে সিনেমার ভাষায় নতুনভাবে আবিষ্কার করতে।’
তরুণ অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়-এর মতে, অভিজ্ঞ সব কলাকুশলীদের সঙ্গে এই কালজয়ী কাজের অংশ হতে পারাটা বিশাল বড় প্রাপ্তি। ছবিটি আন্তর্জাতিক মানের প্রযোজনায় তুলে ধরেছে 'স্বভূমি এন্টারটেইনমেন্ট' যার পেছনে রূপকার হিসেবে রয়েছেন প্রযোজক ড. প্রবীর ভৌমিক এবং বিপাশা ঘোষাল — যিনি বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী-গায়িকা রায়পূর্ণা ভট্টাচার্যের মা।
সবচেয়ে আবেগঘন বিষয় হলো, নাট্যকার বাদল সরকার নিজেও একসময় ফ্রান্সের এই প্যারিস শহরে বসবাস ও শিল্পচর্চা করেছিলেন। তাঁর শতবর্ষে সেই শহরের বুকেই 'পাগলা ঘোড়া'-র এই বর্ণময় যাত্রা যেন এক অপূর্ব বৃত্ত পূরণ করল!