পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ কথাবার্তায় বা রাজনৈতিক চর্চায় প্রায়শই দেখা যায়— বাঙালি-হিন্দুকে সহজ কথায় ‘বাঙালি’ বলা হলেও, বাঙালি-মুসলমানদের চিহ্নিত করতে গিয়ে ‘বাংলাভাষী’ শব্দটির ব্যবহার করা হয়। ভৌগোলিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের এই সূক্ষ্ম বিভাজন নিয়ে এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সমাজমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি স্পষ্ট জানান, বাঙালি পরিচয় কোনো একক ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; ধর্ম বদলে গেলেও জাতিসত্তা বা ভাষার মাটি বদলে যায় না।

‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাভাষী’: পরিচয়ের রাজনীতি ও যুক্তির খামতি
তসলিমা নাসরিনের মতে, যে ব্যক্তি অন্য কোনো ভাষার লোক হয়েও বাংলা শিখে কথা বলেন, তিনি ‘বাংলাভাষী’ হতে পারেন। কিন্তু যার জন্ম, ইতিহাস, সামাজিক স্মৃতি এবং মাতৃভাষা বাংলা—তাকে কেবল ধর্মের বিচারে ‘বাঙালি’ তকমা থেকে বাদ দিয়ে শুধু ‘বাংলাভাষী’ হিসেবে চিহ্নিত করা চরম যুক্তিহীন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন:
একজন বাঙালি-হিন্দু যদি ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ বা নাস্তিক হন, তবে তিনি যদি অবলীলায় ‘বাঙালি’ থাকতে পারেন; তবে কোনো বাঙালির পূর্বপুরুষ শত বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর উত্তরসূরি শুধু ‘বাংলাভাষী’ হবেন কেন, বাঙালি নন কেন?
সমন্বিত সংস্কৃতি ও ভাষার উত্তরাধিকার
পোস্টে লেখিকা উল্লেখ করেন যে, বাংলা সংস্কৃতি কোনো স্থির ছবি নয়। হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর দিয়ে এই সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হলেও সময়ের সাথে সাথে এতে আরবি, ফারসি, সুফি মতবাদ এবং ইউরোপীয় ধারা যুক্ত হয়ে এটি সমৃদ্ধ হয়েছে। ঠিক যেমন সংস্কৃত ও প্রাকৃত শব্দের পাশাপাশি ‘কাগজ’, ‘আইন’, ‘বাজার’ বা ‘স্কুল’-এর মতো বিদেশ থেকে আসা শব্দ মিলেই আধুনিক বাংলা ভাষা গড়ে উঠেছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, বেগম রোকেয়া, সৈয়দ মুজতবা আলী, শাহ আবদুল করিম কিংবা লালন-এর মতো মহীরুহদের বাদ দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস লেখাই অসম্ভব।
উভমুখী কট্টরপন্থার বিরোধিতা
তসলিমা নাসরিন যেমন বাঙালি পরিচয়কে কেবল হিন্দুধর্মের গণ্ডিতে আটকে রাখার কঠোর বিরোধিতা করেছেন, তেমনই যেসমস্ত মুসলিম কট্টরপন্থী নিজেদের ‘বাঙালি’ পরিচয় ছোট করে কেবল ধর্মীয় পরিচয় আঁকড়ে ধরেন কিংবা বাংলা সংস্কৃতিতে ‘হিন্দুয়ানি’ খোঁজেন—তাদেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তসলিমা নাসরিনের চূড়ান্ত বার্তা
{{/usCountry}}তসলিমা নাসরিনের চূড়ান্ত বার্তা
{{/usCountry}}"বাঙালি হওয়ার জন্য কাউকে কোনো বিশেষ ধর্ম পালন করতে হয় না। পূজা করতে হয় না, নামাজও পড়তে হয় না। শাড়ি পরা বা সালোয়ার পরা কোনোটাই বাঙালি হওয়ার পরীক্ষা নয়। বাঙালি-হিন্দু বাঙালি, বাঙালি-মুসলমান বাঙালি, বাঙালি-বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানও বাঙালি। ধর্ম যার যার, বিশ্বাস যার যার। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর কোনো একটি ধর্মের একচেটিয়া মালিকানা নেই।"