১০ অক্টোবর, ১৯৬৪। বোম্বাইয়ের (আজকের মুম্বই) পেডার রোডের আর্কেডিয়া বিল্ডিংয়ের একটি বদ্ধ ঘর। সেই ঘরের এককোণে পড়ে রয়েছে ৩৭ বছরের এক বিষণ্ণ জাদুকরের নিথর দেহ। খাটের পাশের টেবিলে অর্ধেক শেষ হওয়া এক গ্লাস গোলাপি রঙা তরল আর একটি খালি ঘুমের ওষুধের শিশি। হিন্দি সিনেমার ইতিহাসকে 'কাগজ কে ফুল', 'সাহেব বিবি অউর গুলাম'-এর মতো অমর সৃষ্টি উপহার দেওয়া মাস্টারমাইন্ড গুরু দত্ত (Guru Dutt) আর নেই।

তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন? নাকি দুর্ঘটনাবশত ভুল ওষুধের ককটেলে প্রাণ হারিয়েছিলেন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমার অন্যতম সেরা এই রূপকার? ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও উত্তর খোঁজা এই প্রশ্ন আজও বি-টাউনের সবচেয়ে বড় রহস্য। আলো, ছায়া, বিষাদ আর অধরা প্রেমের জালে বোনা তাঁর জীবনটা ছিল যেন তাঁরই তৈরি কোনো ট্র্যাজিক সিনেমার ছায়াছবি।
১. পেডার রোডের সেই অভিশপ্ত রাত: কী ঘটেছিল সেদিন?
মৃত্যুর আগের দিন রাত পর্যন্ত গুরু দত্তের ব্যবহারে কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। বন্ধু তথা সহ-পরিচালক আবরার আলভি জানান, সেদিনও নতুন ছবি নিয়ে জল্পনা করছিলেন তিনি। কিন্তু পর্দার পেছনের বাস্তবটা ছিল ভীষণ রক্তাক্ত।
স্ত্রী গীতা দত্তের (Geeta Dutt) সঙ্গে তীব্র মনোমালিন্যের কারণে একা পেডার রোডের ফ্ল্যাটে থাকতেন গুরু দত্ত। সেই রাতে মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও দুই সন্তানের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গীতা তা হতে দেননি। চরম হতাশায় ডুব দিয়ে এক রাতে গ্লাসে মদ্যপানের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পান করেন তিনি, বলেই শোনা যায়।
রহস্যের অন্ধকার ঘনীভূত হয় এখানে—এটিই কি প্রথম চেষ্টা ছিল? না! এর আগেও দু-দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। একবার আইসিইউ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। কিন্তু তৃতীয়বার পেডার রোডের ঘর থেকে আর জীবন্ত ফেরেননি তিনি। কোনও সুসাইড নোট উদ্ধার হয়নি সেদিন। ফলে রহস্য চিরদিনের মতো ঢাকা পড়ে যায় ইতিহাসের ধুলোয়।
২. ব্যর্থ ভালোবাসা, পারিবারিক অশান্তি ও বিষাদের মায়াজাল
{{/usCountry}}রহস্যের অন্ধকার ঘনীভূত হয় এখানে—এটিই কি প্রথম চেষ্টা ছিল? না! এর আগেও দু-দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। একবার আইসিইউ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। কিন্তু তৃতীয়বার পেডার রোডের ঘর থেকে আর জীবন্ত ফেরেননি তিনি। কোনও সুসাইড নোট উদ্ধার হয়নি সেদিন। ফলে রহস্য চিরদিনের মতো ঢাকা পড়ে যায় ইতিহাসের ধুলোয়।
২. ব্যর্থ ভালোবাসা, পারিবারিক অশান্তি ও বিষাদের মায়াজাল
{{/usCountry}}কেন এত বিষণ্নতা তাড়িয়ে বেড়াত এমন এক কাল্ট প্রতিভাকে? গুরু দত্তের ব্যক্তিগত জীবন ছিল তিনজনের এক জটিল ও রক্তাক্ত ত্রিভুজ—তিনি নিজে, তাঁর স্ত্রী খ্যাতনামা গায়িকা গীতা দত্ত এবং তাঁর শিষ্যা তথা অনবদ্য অভিনেত্রী ওয়াহিদা রেহমান (Waheeda Rehman)।
- ওয়াহিদার আবির্ভাব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন: 'সিআইডি' ছবিতে ওয়াহিদা রেহমানকে সুযোগ দেন গুরু দত্ত। পর্দার পেছনের রসায়ন অনায়াসে পৌঁছে যায় ব্যক্তিজীবনে। ওয়াহিদার প্রতি গুরু দত্তের গভীর অনুরাগ তাঁর ও গীতা দত্তের সুখী দাম্পত্যে ধস নামায়।
- একাকিত্ব ও অ্যালকোহলের নেশা: গীতা দত্ত সন্তানদের নিয়ে আলাদা হয়ে গেলে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন পরিচালক। অন্যদিকে, ওয়াহিদা রেহমানও একসময় তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন। দুটি ভালোবাসার ঘর থেকেই বিতাড়িত হয়ে গুরু দত্ত আশ্রয় নেন চরম অ্যালকোহল ও ঘুমের ওষুধে।
৩. নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী নিজেই করেছিলেন সিনেমায়?
গুরু দত্তের জীবন ও চলচ্চিত্রের অদ্ভুত মিল দেখলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর স্বাতন্ত্র্যসূচক ছবি ‘কাগজ কে ফুল’-এ একজন সফল কিন্তু পরবর্তীতে একাকী ও নিঃস্ব হয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র পরিচালকের মৃত্যুকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছিল, মূল চরিত্রটি কীভাবে একাকীত্বের যন্ত্রণায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
বাস্তব জীবনে ঠিক ৫ বছর পর গুরু দত্তের মৃত্যু যেন সেই সিনেমারই চিত্রনাট্য হুবহু মেনে ঘটে গেল! সিনেমা আর বাস্তব জীবনের এত বড় মেলবন্ধন হিন্দি চলচ্চিত্রে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায়নি।
গুরু দত্ত বলতেন, "খুশি তো এক পাল কি হোতি হ্যায়, গম হি তো আসলি সাথী হ্যায়।" সেলুলয়েডের ফ্রেমে যিনি আলো ও ছায়ার অলৌকিক খেলা দেখাতেন, জীবনের আলো নেভানোর খেলায় নিজেই একসময় হেরে গেলেন। রহস্যের চাদরে ঢাকা তাঁর এই তিরোধান আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রের দরবারে এক মস্ত বড় প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।