তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার সাংসদ তথা অভিনেত্রী সায়নী ঘোষকে ‘খুন’ করার প্রকাশ্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠল উত্তরপ্রদেশের এক বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে। সিকন্দরাবাদের পুরপ্রধান (নগর পালিকা চেয়ারম্যান) তথা বিজেপি নেতা ডক্টর প্রদীপ দীক্ষিতের একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তাঁকে বলতে শোনা যাচ্ছে— যে ব্যক্তি সায়নী ঘোষের কাটা মাথা এনে দিতে পারবে, তাকে ১ কোটি টাকার ক্যাশ পুরস্কার দেওয়া হবে! এই ভয়ঙ্কর ভিডিও সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে নিন্দার ঝড় উঠেছে। এবার এই নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ট্যাগ করে এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন সায়নী ঘোষ।

‘এটাই কি নিউ ভারতের নারী শক্তি বন্দন?’ প্রশ্ন সায়নীর:
প্রকাশ্য মৃত্যুর হুমকি পাওয়ার পর সায়নী ঘোষ এক্স-এ লেখেন, “আমি অত্যন্ত স্তম্ভিত যে উত্তরপ্রদেশের সিকন্দরাবাদের একজন পুরপ্রধান এবং বিজেপি নেতা প্রকাশ্যে আমার মাথা কেটে আনার জন্য ১ কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করছেন। এই হুমকি সমাজমাধ্যম এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমে দেদার ঘুরছে।”
বিজেপি শাসিত রাজ্যের একজন জনপ্রতিনিধির এমন মন্তব্য নিয়ে সুর চড়িয়ে তৃণমূল সাংসদ আরও লেখেন, “বিজেপি শাসিত রাজ্যে একজন বিজেপি জনপ্রতিনিধি কর্তৃক একজন মহিলা এবং বর্তমান সংসদের সদস্যের মাথা কাটার ফতোয়া জারি করা— এটাই কি আপনাদের ‘নিউ ভারত’-এর ‘নারী শক্তি বন্দন’ প্রকল্পের আসল রূপ?” মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে ওই বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সায়নী।
ঠিক কী ঘটেছিল?
২০১৫ সালে সায়নী ঘোষের এক্স (তৎকালীন টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে শিবলিঙ্গ নিয়ে একটি আপত্তিকর ছবি পোস্ট করা হয়েছিল, যা নিয়ে পরবর্তীতে তথাগত রায় সহ একাধিক বিজেপি নেতা এফআইআর (FIR) করেন। সায়নী অবশ্য বহু আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ২০১৫ সালে তাঁর অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল এবং হ্যাকাররাই সেই ছবি পোস্ট করেছিল, যা অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পরই তিনি মুছে দেন। কিন্তু সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের সিকন্দরাবাদে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর একটি প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিয়ে বিজেপি নেতা প্রদীপ দীক্ষিত সায়নীর সেই পুরোনো পোস্টের প্রসঙ্গ তুলে এই ‘মাথা কাটার’ বিতর্কিত ফতোয়া জারি করেন।
ভিডিও ‘এআই’ (AI) কারসাজি, দাবি বিজেপি নেতার:
{{/usCountry}}ভিডিও ‘এআই’ (AI) কারসাজি, দাবি বিজেপি নেতার:
{{/usCountry}}বিতর্ক মাত্রাছাড়া রূপ ধারণ করতেই অবশ্য সুর বদলেছেন অভিযুক্ত বিজেপি নেতা প্রদীপ দীক্ষিত। তাঁর দাবি, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ভুয়ো এবং তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তি (AI manipulation) ব্যবহার করে তাঁর কণ্ঠস্বর ও ভিডিওতে কারসাজি করা হয়েছে। তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে, বুলন্দশহরের জেলা বিজেপি সভাপতি বিকাশ চৌহান এই মন্তব্য থেকে দলকে দূরে সরিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, “এটি ওঁর ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে, দল কখনওই এই ধরনের কুরুচিকর মন্তব্য সমর্থন করে না।”
‘আমাকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে না
হুমকির মুখেও যে তিনি এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নন, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সায়নী। শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি পোস্টের শেষে লেখেন, “আমার নিরাপত্তা নিয়ে যাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের ধন্যবাদ। তবে আশ্বস্ত করতে চাই, সংসদের ভেতরে এবং বাইরে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে আমি প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর জারি রাখব। আমাকে এভাবে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে না।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ট্যাগ করে দিলীপ ঘোষ এক্সে লিখেছেন: "উত্তরপ্রদেশের সিকান্দ্রাবাদের নগর পালিকা চেয়ারম্যান এবং বিজেপি নেতা ছাড়া আর কেউ আমার শিরশ্ছেদের জন্য 1 কোটি টাকা পুরষ্কারের ঘোষণা করা একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দেখে আমি অবাক হয়েছি। এই হুমকি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মূলধারার গণমাধ্যমে এটি রিপোর্ট করা হয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিজেপির জনপ্রতিনিধি জারি করে একজন মহিলার শিরশ্ছেদ করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা কি নতুন ভারতে 'নারী শক্তি বন্দন'-এর আসল ধারণা? মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়েও বিজেপি নেতৃত্বকে প্রশ্ন তুলতে দিলীপ ঘোষ বলেন, একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি এখন ক্ষমতাসীন দলের এক সদস্যের কাছ থেকে "প্রকাশ্য মৃত্যুর হুমকির" মুখোমুখি হচ্ছেন। বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশ পুলিশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, 'আমি আমার সব শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমার নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি সংসদের ভিতরে এবং বাইরে ভিন্নমতের কণ্ঠস্বর হওয়ার জন্য আমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ চালিয়ে যাব এবং আমাকে চুপ করে উৎপীড়ন করা হবে না। ঘোষকে নিয়ে বিতর্ক কেন? এই বিতর্কটি ঘোষের অ্যাকাউন্ট থেকে 2015 সালের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে উদ্ভূত হয়েছিল যা 2021 সালে এবং আবার সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় পুনরায় প্রকাশিত হয়েছিল। এর আগে এই পোস্ট নিয়ে তার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন যে 2015 সালে তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছিল এবং ছবিটি হ্যাকার আপলোড করেছিল। তিনি বলেছিলেন যে অ্যাকাউন্টে অ্যাক্সেস ফিরে পাওয়ার সাথে সাথেই পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।