ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের কণ্ঠ কখনও পুরনো হয় না। তাঁদেরই অন্যতম কিংবদন্তি গায়ক, অভিনেতা ও সুরকার কিশোর কুমার। আজও ইউটিউব থেকে রেডিয়ো—সব জায়গাতেই সমান জনপ্রিয় তাঁর গান। তবে শুধু অসাধারণ কণ্ঠ নয়, খামখেয়ালি স্বভাব, তীক্ষ্ণ রসবোধ এবং নিজের শর্তে বাঁচার জন্যও তিনি ছিলেন অনন্য। ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কিশোর কুমার। চলুন ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবনের এমন কিছু ঘটনা, যা আজও বিস্মিত করে অনুরাগীদের।
অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে কেন নিষিদ্ধ হয়েছিলেন কিশোর কুমার?

ছোটবেলা থেকেই গায়ক হওয়ার স্বপ্ন ছিল কিশোর কুমারের। বড় ভাই অশোক কুমারের পরামর্শে অভিনয়ে এলেও সেই পথে প্রথমদিকে তেমন সাফল্য পাননি। ১৯৪৮ সালে 'জিদ্দি' ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করার সুযোগ পান। তবে ১৯৬৯ সালের 'আরাধনা' ছবির 'মেরে সপ্নো কি রানি' গানই তাঁকে এনে দেয় সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা। রাজেশ খান্না ও কিশোর কুমারের জুটি তখন বলিউডের সবচেয়ে সফল কম্বিনেশনগুলির একটি হয়ে ওঠে।
তবে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন কিশোর কুমার। এরপর তাঁর গান গান অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো এবং দূরদর্শনে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে কার্যত নিষিদ্ধ ছিলেন তিনি।
'Beware of Kishore Kumar'—বাড়ির বাইরে কেন ছিল এমন সাইনবোর্ড?
মুম্বইয়ের 'গৌরী কুঞ্জ' বাংলোর বাইরে ঝুলত একটি সাইনবোর্ড—'Beware of Kishore Kumar'। এটি নিছক মজা ছিল না। একবার এক পরিচালক বকেয়া পারিশ্রমিক মিটিয়ে করমর্দন করতে গেলে কিশোর কুমার নাকি সত্যিই তাঁর হাতে কামড়ে দেন। পরে মজা করে বলেন, বাইরে লেখা সতর্কবার্তাটি আগে পড়া উচিত ছিল। শুধু তাই নয়, আর এক প্রযোজকের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা বকেয়া না পেয়ে তাঁর বাড়ির সামনে গিয়ে নাচতে নাচতে টাকা দাবি করেছিলেন বলেও শোনা যায়। এমনই আরও মজার কাণ্ডকারখানা রয়েছে এই কিংবদন্তিকে ঘিরে।
১. অর্ধেক টাকা, তাই অর্ধেক মেকআপ!
{{/usCountry}}১. অর্ধেক টাকা, তাই অর্ধেক মেকআপ!
{{/usCountry}}কিশোর কুমারের একটি নীতি ছিল—'আগে টাকা, তারপর কাজ।' একবার এক প্রযোজক পুরো পারিশ্রমিক না দিয়ে অর্ধেক টাকা দেন। প্রতিবাদে কিশোর কুমার মুখের এক পাশেই মেকআপ করে শুটিং ফ্লোরে হাজির হন। কারণ জানতে চাইলে তাঁর জবাব ছিল, ‘অর্ধেক টাকা, তাই অর্ধেক মেকআপ!’
২. গাছের সঙ্গেই চলত গল্প
চকচকে পার্টির চেয়ে প্রকৃতির সঙ্গেই সময় কাটাতে বেশি ভালোবাসতেন তিনি। নিজের বাগানের প্রতিটি গাছের আলাদা নাম রেখেছিলেন। অবসর পেলেই গাছগুলোর সঙ্গে গল্প করতেন, যেন তারা তাঁর পরিবারেরই সদস্য।
৩. সাংবাদিককে খাঁচার ভেতরে বন্দি!
একবার এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে তাঁর বাড়িতে গেলে কিশোর কুমার তাঁকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে একটি বড় খাঁচা এনে তাঁর মাথার ওপর চাপিয়ে দেন। তারপর বলেন, ‘খাঁচার ভেতরে থাকা প্রাণীদের কেমন লাগে, এবার বুঝতে পারবেন।’ ঘটনাটি তাঁর অদ্ভুত রসবোধের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে এখনও আলোচিত।
৪. আলমারির ভেতর থেকে পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক
একজন পরিচালক সিনেমার প্রস্তাব নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর আলমারির ভেতর থেকে কিশোর কুমারের গলা শুনতে পান। পরে দেখা যায়, তিনি আলমারির মধ্যেই বসে স্ক্রিপ্ট ও পারিশ্রমিক নিয়ে আলোচনা করছেন!
৫. বাড়ির দেওয়ালে কঙ্কাল ঝুলিয়ে অতিথিদের ভয় দেখাতেন
নিজের বাড়ির বসার ঘরে কঙ্কাল ও মানুষের মাথার খুলির প্রতিরূপ সাজিয়ে রাখতেন তিনি। নতুন অতিথি বা প্রযোজক এলেই ঘরের আলো নিভিয়ে সেগুলো জ্বালিয়ে দিতেন। অনেকেই ভয় পেয়ে যেতেন, আর সেটাই ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় দুষ্টুমি।
৬. নিজের মৃত্যুকেও নিয়েও করেছিলেন রসিকতা
জীবনের শেষ দিকেও তাঁর রসবোধ অটুট ছিল। বন্ধুদের তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি মারা গেলে কেউ কাঁদবে না। সবাই আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে হইচই করবে, পপকর্ন খাবে।’ মৃত্যুর মতো গুরুতর বিষয় নিয়েও তিনি এমন হালকা মেজাজে কথা বলতে পারতেন।
আজও অমলিন কিশোর কুমার
গায়ক, অভিনেতা, সুরকার কিংবা কৌতুকপ্রিয় মানুষ—প্রতিটি পরিচয়েই ছিলেন ব্যতিক্রমী। তাঁর গান যেমন আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে, তেমনই তাঁর অদ্ভুত, মজার এবং খামখেয়ালি জীবনের গল্পও আজও সমান আগ্রহ নিয়ে শোনেন ভক্তরা। তাই কিশোর কুমার শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ভারতীয় বিনোদন জগতের এক চিরকালীন কিংবদন্তি।