২০০ কোটি টাকার মেগা আর্থিক তছরুপ এবং তোলাবাজি মামলায় কুখ্যাত প্রতারক সুকেশ চন্দ্রশেখরের কীর্তি নিয়ে তোলপাড় গোটা দেশ। তবে এই অপরাধের জল যে বলিউডের অন্দরেও বেশ ভালোভাবেই ঢুকে পড়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) এবং দিল্লির আদালত বলিউড সুন্দরী জ্যাকলিন ফার্নান্দেজকে (Jacqueline Fernandez) এই মামলার সাধারণ কোনো সাক্ষী নয়, বরং সরাসরি অন্যতম ‘অভিযুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে। জ্যাকলিনের হাজারো সাফাই এবং নিজেকে ‘নির্দোষ ভিকটিম’ বা শিকার বলে দাবি করা সত্ত্বেও আদালত কেন ওঁর দিকেই আঙুল তুলল? আইনের কোন মারপ্যাঁচে ফেঁসে গেলেন এই শ্রীলঙ্কান সুন্দরী, তার ৫টি প্রধান কারণ নিচে দেওয়া হলো:

১. সব জেনেও সুকেশের সাথে মাখামাখি, রেড ফ্ল্যাগ এড়ানোর খেসারত
আদালতের চোখে জ্যাকলিনকে অভিযুক্ত করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সুকেশ চন্দ্রশেখরের আসল পরিচয় জানার পরও ওঁর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা। তদন্তে দেখা গিয়েছে, সুকেশের অপরাধের খতিয়ান, আগের গ্রেফতারি এবং ২০০ কোটির এই তোলাবাজির কেলেঙ্কারি যখন সংবাদমাধ্যমের সৌজন্যে গোটা দেশের সামনে চলে আসে, তার পরেও জ্যাকলিন সুকেশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং ওঁর দেওয়া দামি উপহার গ্রহণ করতেন। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ছিল, জ্যাকলিন আর্থিক লোভের বশবর্তী হয়ে সুকেশের এই সমস্ত অপরাধের ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা বিপজ্জনক সঙ্কেতগুলোকে জেনেশুনে উপেক্ষা করেছিলেন।
২. তোলাবাজির ‘প্রোসিডস অফ ক্রাইম’ বা অপরাধের টাকায় দেদার বিলাসিতা
প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (PMLA) বা অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইনের মূল কথাই হলো, অপরাধের মাধ্যমে উপার্জিত যেকোনো সম্পত্তি বা টাকাই হলো ‘প্রোসিডস অফ ক্রাইম’।
ইডি তদন্তে প্রমাণ করেছে যে, ফোর্টিস হেলথকেয়ারের প্রাক্তন প্রোমোটার শিবিন্দর সিংয়ের স্ত্রী অদিতি সিংয়ের কাছ থেকে সুকেশ যে ২০০ কোটি টাকা কুক্ষিগত করেছিল, সেই টাকা দিয়েই জ্যাকলিনের জন্য কোটি কোটি টাকার উপহার কেনা হয়েছিল।
{{/usCountry}}ইডি তদন্তে প্রমাণ করেছে যে, ফোর্টিস হেলথকেয়ারের প্রাক্তন প্রোমোটার শিবিন্দর সিংয়ের স্ত্রী অদিতি সিংয়ের কাছ থেকে সুকেশ যে ২০০ কোটি টাকা কুক্ষিগত করেছিল, সেই টাকা দিয়েই জ্যাকলিনের জন্য কোটি কোটি টাকার উপহার কেনা হয়েছিল।
{{/usCountry}}এই উপহারের তালিকায় ছিল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ডিজাইনার ব্যাগ, হিরের গয়না, বহুমূল্য ঘড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি থেকে শুরু করে চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে বিদেশ ভ্রমণের খরচ।
যেহেতু জ্যাকলিন জেনেশুনে অপরাধের টাকায় কেনা এই সমস্ত রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করেছেন, তাই আইনত তিনি এই ‘প্রোসিডস অফ ক্রাইম’-এর সরাসরি অংশীদার ও উপভোক্তা।
৩. জ্যাকলিনের পরিবারকেও কোটি টাকার লোভ দেখায় সুকেশ
তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, সুকেশের এই আর্থিক বদান্যতা শুধু জ্যাকলিন একার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সুকেশ চন্দ্রশেখর জ্যাকলিনের বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের (বাবা, মা এবং ভাইবোন) অ্যাকাউন্টেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ট্রান্সফার করেছিল এবং ওনাদের জন্য বিলাসবহুল গাড়িও স্পনসর করেছিল। সুকেশের সাথে জ্যাকলিনের এই গভীর ও বৈষয়িক পারিবারিক লেনদেন দেখেই আদালত নিশ্চিত হয় যে, এটি কোনো সাধারণ বা সাময়িক পরিচয় ছিল না, বরং বেশ পরিকল্পিত এক যোগসাজশ।
৪. প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা এবং তদন্তে অসহযোগিতা
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে জ্যাকলিনের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তোলে ইডি। অভিযোগ ওঠে, সুকেশের কুকীর্তি সামনে আসতেই জ্যাকলিন ওঁর ফোন থেকে চ্যাট হিস্ট্রি, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এবং কল লগস ডিলিট বা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। এজেন্সির যুক্তি ছিল, কোনো মানুষ যদি সত্যিই নিজেকে কোনো অপরাধের শিকার বা নির্দোষ মনে করেন, তবে তিনি এভাবে জেরা বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ার আগে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা তথ্য প্রমাণ নষ্ট করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতেন না। ওঁর এই পদক্ষেপই ওঁর অপরাধবোধের দিকে ইঙ্গিত করে।
৫. পিএমএলএ (PMLA) আইনের ৩ নম্বর ধারার ফাঁস
অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইনের (PMLA) ধারা ৩ অনুযায়ী— কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপরাধের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের দখল, ব্যবহার, বা তা নিজের কাছে রাখার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকেন, তবে তিনি অর্থ তছরুপের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন। জ্যাকলিনের ক্ষেত্রে যেহেতু অপরাধের টাকায় কেনা বিপুল সম্পত্তি ওঁর দখলে ছিল এবং তিনি তা ব্যবহার করেছিলেন, তাই আইনি পরিভাষায় তিনি কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। ফলস্বরূপ, ওঁর সমস্ত আবেদন খারিজ করে দিল্লির আদালত সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটে জ্যাকলিনকে অফিশিয়ালি সহ-অভিযুক্ত বা কো-অ্যাকিউসড হিসেবে ঘোষণা করে। গ্ল্যামার আর অপরাধের এই জটিল ককটেল থেকে জ্যাকলিন নিজেকে কীভাবে মুক্ত করেন, এখন সেটাই দেখার!