সঙ্গীত দুনিয়ায় এক যুগের অবসান ঘটল। আপামর শ্রোতাকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন ভারতের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম এবং কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী এস জানকী (S Janaki)। বিগত ১১ই জুলাই (শনিবার) মহীসূরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে ওঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

দক্ষিণী সিনেমার জগতে তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন, যাঁকে কোটি কোটি অনুরাগী পরম শ্রদ্ধায় ‘দক্ষিণের নাইটিঙ্গেল’ (Nightingale of the South) এবং ভালোবেসে ‘জানকী আম্মা’ বলে ডাকতেন। তাঁর প্রয়াণের খবর পরিবারের তরফ থেকে নিশ্চিত করা হতেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত মহলে।
ঠাকুমার প্রয়াণে নাতনি অপ্সরার আবেগঘন বার্তা
শনিবার জানকী আম্মার মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর গায়িকার নাতনি অপ্সরা বৈদ্যুলা (Apsara Vydula) নিজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি শোকবার্তা শেয়ার করেন। তিনি লেখেন,'গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে আমার প্রিয় দাদিমা এবং কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী শ্রীমতি এস জানকী আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। পরিবারের সকলের ভালোবাসার মাঝেই তিনি অত্যন্ত শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমাদের হৃদয় আজ ভারাক্রান্ত হলেও, তিনি যে অসাধারণ এক জীবন যাপন করে গিয়েছেন এবং ওঁর কালজয়ী গানের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের জীবনে যে অপরিসীম আনন্দ এনে দিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।'
তিনি আরও যোগ করেন, ‘সারা বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন এক আইকনিক কণ্ঠস্বর, যাঁর গান মানুষের অজস্র স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে। আর আমাদের কাছে তিনি ছিলেন এক স্নেহময়ী দিদিমা, যাঁর ওম, নম্রতা, দয়া এবং লালিত্য আমাদের মনে আজীবন থেকে যাবে।’ এই কঠিন সময়ে শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি সকলের কাছে পরিবারের গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন。
{{/usCountry}}তিনি আরও যোগ করেন, ‘সারা বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন এক আইকনিক কণ্ঠস্বর, যাঁর গান মানুষের অজস্র স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে। আর আমাদের কাছে তিনি ছিলেন এক স্নেহময়ী দিদিমা, যাঁর ওম, নম্রতা, দয়া এবং লালিত্য আমাদের মনে আজীবন থেকে যাবে।’ এই কঠিন সময়ে শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি সকলের কাছে পরিবারের গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন。
{{/usCountry}}শৈশব থেকে সঙ্গীতজগতের ‘আম্মা’ হয়ে ওঠার জার্নি
জন্ম ও শৈশব: ১৯৩৮ সালের ২৩শে এপ্রিল অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুরের পল্লাপত্তলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিস্টলা জানকী। তাঁর বাবা শ্রীরামমূর্তি ছিলেন একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ও শিক্ষক। জানকীর শৈশবের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল সিরসিলায় এবং মাত্র ৯ বছর বয়সেই তিনি প্রথমবার মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পান।
কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাসিক্যাল ট্রেনিং না থাকা সত্ত্বেও তিনি নাদস্বরম বিদ্যান পাইদিস্বামীর কাছ থেকে সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন।
চেন্নাই পাড়ি ও প্রথম গান: কুড়ি বছর বয়সে কাকার পরামর্শে চেন্নাই চলে আসেন জানকী এবং এভিএম স্টুডিওতে সুরকার আর সুদর্শনের সাথে একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে তামিল ছবি ‘বিধিয়িন বিলায়াত্তু’ (Vidhiyin Vilayattu) এবং পরবর্তীতে তেলুগু ছবি ‘এম.এল.এ.’ (M.L.A.)-র মাধ্যমে ওঁর প্লে-ব্যাক কেরিয়ারের সূচনা হয়।
২০টিরও বেশি ভাষায় গান ও নজিরবিহীন সম্মান
এস জানকী তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারে বাংলা, তেলুগু, তামিল, কন্নড়, মালায়ালম, হিন্দি, সংস্কৃত, ওড়িয়া, উর্দু, পাঞ্জাবি, কোঙ্কনি সহ প্রায় ২০টি ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন। শুধু তাই নয়, ইংরেজি, জাপানি, জার্মান এবং সিংহলী ভাষার মতো একাধিক বিদেশী ভাষাতেও ওঁর কণ্ঠের জাদু ছড়িয়ে পড়েছে।
নিজের অসামান্য গায়কীর জন্য তিনি কেরিয়ারে ৪টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Awards) এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের তরফ থেকে রেকর্ড ৩৩টি রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার (State Film Awards) লাভ করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও ট্র্যাজেডি
১৯৫৯ সালে জানকী দেবী ভি রামপ্রসাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি ওঁকে কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে সবসময় উৎসাহ দিতেন। ১৯৯৭ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রামপ্রসাদ মারা যান। শিল্পীর একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন মুরলী কৃষ্ণ, যিনি দুর্ভাগ্যবশত চলতি বছরের জানুয়ারিতেই প্রয়াত হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে একের পর এক পারিবারিক ক্ষতি এবং শারীরিক বার্ধক্য গ্রাস করলেও ওঁর গান ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।