সোশাল মিডিয়ায় সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের আসন্ন সিনেমা ‘কিং’ (KING)-এর প্রকাশিত নতুন গান ‘তু মিল যায়ের’-র সুরের শুরুর অংশের সঙ্গে প্রখ্যাত বামপন্থী সঙ্গীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক-এর কালজয়ী সৃষ্টি ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি’ গানটির এক অদ্ভুত ও ‘আনক্যানি’ মিল রয়েছে। একজন অনুরাগী সেই বিতর্কিত পোস্টটি মৌসুমী ভৌমিককে স্বয়ং ট্যাগ করে তাঁর মতামত জানতে চান।

সাধারণত সুর চুরির অভিযোগে সংগীতাঙ্গনে চরম বিতর্ক ও কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হলেও, মৌসুমী ভৌমিকের শান্ত, সহনশীল ও সুগভীর জীবনদর্শন এবং সুরের বিশ্লেষণ নেটপাড়ায় কুড়িয়ে নিচ্ছে বিপুল প্রশংসা।
'আমার কিন্তু তেমন মনে হয়নি”— সুরের মিল নিয়ে ব্যাখ্যা:
অনুরাগীর ট্যাগ করা সেই পোস্টের জবাব দিতে গিয়ে মৌসুমী ভৌমিক অত্যন্ত নম্রতার সঙ্গে জানান যে, শ্রোতার শোনার দৃষ্টিভঙ্গি তিনি সম্মান করলেও এই গানে নিজের কোনো ছায়া দেখতে পাননি।
মৌসুমী ভৌমিক লেখেন, ‘তুমি আমায় জানাতে চেয়েছ বলেই নিশ্চয় ট্যাগ করেছ। আমি এই গান আগে শুনিনি, তুমি বললে বলে শুনলাম। কিন্তু আমার তোমার মতন মনে হয়নি। দেখো, আমরা ঘুরে ফিরে সকলেই একই স্বর নিয়ে খেলা করি, একই স্বরের পারমিউটেশন কম্বিনেশন। এই গানে আমার গানের ছায়া— আমার কিন্তু তেমন মনে হয়নি।’
পাঁচালীর সুর ও গাছের মতো বেড়ে ওঠার দর্শন:
নিজের সৃষ্টিকে কোনো ‘অমোঘ বা আনকোরা’ কিছু বলে অহংকার না করে, বাঙালি লোকসঙ্গীত ও পাঁচালীর সুরের ধারার সঙ্গে নিজ গানের সংযোগ তুলে ধরেন গায়িকা।
{{/usCountry}}নিজের সৃষ্টিকে কোনো ‘অমোঘ বা আনকোরা’ কিছু বলে অহংকার না করে, বাঙালি লোকসঙ্গীত ও পাঁচালীর সুরের ধারার সঙ্গে নিজ গানের সংযোগ তুলে ধরেন গায়িকা।
{{/usCountry}}তিনি যোগ করেন, ‘তা ছাড়া, আমি এমন কোনো অমোঘ সৃষ্টি করিনি; এতই আনকোরা কোনো মিউজিক্যাল ফ্রেজ, আগে কেউ কোনোদিন এমনটা করেনি— এমন না। এই স্বরের সমষ্টি আমাদের পাঁচালীতে শুনতে পাবে। ‘শুনেছি সেদিন’ যেমন করে শুরু হয়, তার বিশ্লেষণ করলে দেখবে, পাঁচালীর মিউজিক্যাল ফ্রেজ। কিন্তু আমার গান সেখানে আটকে থাকে না, সেই বীজ থেকে সে গাছ হয়ে ওঠে। আমি সচেতন ভাবে পাঁচালী ভাবিনি, কিন্তু নিশ্চয় আমার শোনার ভিতরে যা ছিল, তার থেকেই আমার সুর জন্ম নিয়েছে।’
‘ছায়া আমরা সবাই বহন করি, জেনে অথবা না জেনে’
নিজের সঙ্গীত জীবনের একটি চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে আবহ ও ছায়ার প্রভাব সম্পর্কে মৌসুমী বলেন, একবার এক বন্ধু তাঁর গান শুনে জোন বায়েজের (Joan Baez) কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ তিনি সেটি ভেবে গান বানাননি।
অকপটে তিনি প্রকাশ করেন, ‘আসলে কী জানো? ছায়া আমরা সবাই বহন করি। জেনে অথবা না জেনে। আমিও। তুমিও। আমরা যা চিনি, যাকে চিনি, তার ছায়া দেখি অন্যের মুখে। তোমার দেখাতে অথবা শোনাতে কোনো ভুল নেই, কিন্তু তার মানে একেবারেই এই নয় যে এই গানের সঙ্গে আমার গানের কোনো সম্পর্ক আছে। আর থাকেও যদি, তাতেই বা কী এসে যায়? সত্যি যদি হুবহু কেউ একজনের থেকে কিছু নিয়ে কপি করে নিজের বলে চালায়, তখন ভাবা উচিত অবশ্যই, না হলে এভাবে ভেবো না।’
একজন প্রকৃত শিল্পীর এই উদার মানসিকতা ও সুরের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে এমন সাবলীল ব্যাখ্যা সোশাল মিডিয়ায় সুরপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছে।