দু- মাস আগে টলিউড হারিয়েছে তার অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়ার ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি টলিপাড়া ও তাঁর কাছের মানুষেরা। বুধবার ভোরে ফের একবার মাঠে নামছে প্রিয় দল আর্জেন্টিনা, আর তার ঠিক আগেই রাহুলের স্মৃতিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ, মন ছুঁয়ে যাওয়া আবেগঘন পোস্ট লিখলেন তাঁর প্রিয় 'শ্রীজাতদা' অর্থাৎ প্রখ্যাত কবি-গীতিকার শ্রীজাত।

মারাদোনা-মেসি এবং আর্জেন্টিনার প্রতি রাহুলের যে অন্ধ ও পাগল করা ভালোবাসা ছিল, সেই না-বলা বন্ধুত্বের রূপকথাকেই নিজের শব্দে ফ্রেমে বাঁধলেন কবি।
২০২২ বিশ্বকাপের সেই মারাদোনা টি-শার্ট ও রাহুলের পাগলামি
শ্রীজাত মনে করিয়ে দিয়েছেন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগের একটা সকালের কথা। হঠাৎ সাতসকালে রাহুলের ফোন— ‘শ্রীজাতদা, তোমার টি-শার্টের সাইজ কত?’। কোনো পুজোর মরশুম নয়, কিছু নয়, হঠাৎ টি-শার্ট কেন? রাহুল উত্তেজিত হয়ে জানিয়েছিলেন, ‘গুরুর’ (মারাদোনা) ছবি দিয়ে নিজের উদ্যোগে সাদা আর কালো রঙের দুটো টি-শার্ট ছাপিয়েছেন তিনি, যা তাঁর আর্জেন্টিনার ‘দলের’ কাছের মানুষদের উপহার দিচ্ছেন।
সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর যখন নেটপাড়ায় ট্রোল হচ্ছিল, তখন রাহুলই শ্রীজাতকে ফোনে ভরসা দিয়ে বলেছিলেন— "ছাড়ো তো শ্রীজাতদা! ওসব হা-হা দু’দিনে শুকিয়ে যাবে। কাপ এবার আমাদের!" শেষমেশ ডিসেম্বরের সেই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে মেসি যখন বিশ্বকাপ তুললেন, তখন ফোনের এপার-ওপার থেকে দুই বন্ধুর একসাথে হাউহাউ করে কাঁদার সেই মুহূর্ত আজও শ্রীজাতর স্মৃতিতে টাটকা। ২০২০ সালে মারাদোনার মৃত্যুর দিনও এভাবেই ফোনে একসাথে কেঁদেছিলেন দুজনে।
‘শ্মশানের সেই জামাপ কাট কোনো চিত্রনাট্যকারও লিখতে পারবে না’
{{/usCountry}}‘শ্মশানের সেই জামাপ কাট কোনো চিত্রনাট্যকারও লিখতে পারবে না’
{{/usCountry}}রাহুলের মনটা কতটা বড় ছিল, তা বোঝাতে শ্রীজাত তাঁর মায়ের মৃত্যুর দিনের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। শ্রীজাতর মা ছিলেন রজার ফেডেরারের কট্টর ভক্ত। মা যেদিন চলে গেলেন, শ্মশানে হঠাৎ উদভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিলেন রাহুল। শুটিং ফেলে চলে আসা রাহুলকে শ্রীজাত জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘শুট ফেলে আসতে গেলে কেন?’ রাহুল হাত দুটো ধরে বলেছিলেন— ‘কী বলছ শ্রীজাতদা? কাকিমা চলে গেল, আমি একবার তোমার কাছে আসব না? এটা হয়? ফেডেরারের একজন সাচ্চা ফ্যান আজ চলে গেল।’ কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! শ্রীজাত লিখেছেন: ‘তখনও আমি জানি না, সেই ও আমার দু’চোখ থেকে চিরতরে ফ্রেম আউট করছে। দেখা হলো ঠিকই, দু’মাস পরে, আর ঠিক ওই শ্মশান চত্বরেই। কেবল এবার খবর পেয়ে ছুটে এসেছি আমি আর দূর্বা, রাহুল শুয়ে আছে ফুলে ঢাকা, নিথর। কোনো বৈপ্লবিক চিত্রনাট্যকারও এরকম একটা জাম্প কাট লেখার আগে দশবার ভাববে, এবং শেষমেশ লিখবে না। কিন্তু জীবনের এসব নিয়ে অতশত ভাবনা নেই। রাহুলকে আবার জড়িয়ে ধরলাম। আমাদের সেই দলের জার্সি ওর বুকের ওপর বিছিয়ে রাখা।’
শেষ মেসেজের সেই অদ্ভুত আকুতি: 'মরে যাব তো তোমার কিছু হলে!'
শ্রীজাতর স্ত্রী দূর্বাকে নিজের দিদির মতো ভালোবাসতেন রাহুল। মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে শ্রীজাতর গাড়ি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাত দেড়টায় রাহুল মেসেজ করেছিলেন— ‘কী গো, ঠিক আছ তো? মরে যাব তো তোমার কিছু হলে!’ শ্রীজাত আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘এভাবে কে লেখে? কে লিখতে পারে? যে পাগল। যে পাগলের মতো ভালোবাসে।’ বুধবার ভোরে আর্জেন্টিনা আবার বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করছে। মূল প্রতিযোগিতা শুরুর আগে প্রীতি ম্যাচ খেলতে নামছে। সামনে আরও একটা বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি, যেখানে মেসি শেষবার খেলবেন দেশের জার্সিতে। কিন্তু আর্জেন্টিনার সেই ‘পাগল’ সমর্থক রাহুল আজ আর গ্যালারিতে বা টিভির সামনে নেই। আলমারিতে পাট করে রাখা আছে রাহুলের দেওয়া সেই মারাদোনার টি-শার্ট দুটো। শ্রীজাতর বিষণ্ণ প্রশ্ন— যদি এবারও আর্জেন্টিনা জেতে বা হারে, চোখ তো ভিজবেই, কিন্তু— ‘তখন আমি কাকে ফোন ক’রে কাঁদব, রাহুল?’