আজ থেকে ৩৯ বছর আগের কথা। রবিবারের সকাল ৮টা বাজলেই থমকে যেত দেশের সমস্ত রাস্তাঘাট। ড্রয়িংরুমের ছোট পর্দা থেকে ভেসে আসত দূরদর্শনের সেই কালজয়ী সুর— রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’। চাল-ডাল-আনাজের বাজার ফেলে কিংবা খেলার মাঠ ছেড়ে গোটা দেশ একজোট হতো টিভির সামনে, ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বসা হতো পর্দার সামনে। সেই সংস্কৃতি, সেই আবেগকে ছুঁতে যাওয়া কেবল এক দুঃসাহস নয়, হিমালয় ডিঙানোর সমতুল্য এক মহাযজ্ঞ।

নমিত মালহোত্রা, নিতেশ তিওয়ারি এবং ৪,০০০ কোটি টাকার মেগা বাজেট কি পেরেছে সেই নস্টালজিয়া আর মহাকাব্যের আত্মাকে এক সুতোয় গাঁথতে? সংক্ষেপে বললে— হ্যাঁ, এই ‘রামায়ণ’ আমাদের চোখ ধাঁধায়, একই সাথে বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বুক টান টান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়!
চেনা গল্পের নতুন ব্যাকগ্রাউন্ড ও দীর্ঘ রূপরেখা:
বাল্মীকি রামায়ণের আদি সুর ধরে এই ছবির শুরু রামকে দিয়ে নয়, বরং লঙ্কাপতি রাবণের অতীত আর তাঁর উত্থানের গল্প দিয়ে। প্রযোজক নমিত মালহোত্রা ও পরিচালক নিতেশ তিওয়ারির চিত্রনাট্য এই প্রথম পর্বে চরিত্রগুলোর গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য অনেকটা সময় নিয়েছে।
ছবিটিকে দু'টি ভাগে ভাগ করার কারণে প্রথম ভাগের গতি খানিকটা মন্থর। চরিত্রগুলির দীর্ঘ ভূমিকা এবং মাঝে মাঝে সামান্য কৃত্রিম এআই (AI) ডাবিং প্রথম ভাগের ছন্দ কিছুটা ব্যাহত করে। তবে প্রথমার্ধের ধীরগতিকে ভুলিয়ে দেয় ছবির দ্বিতীয় ভাগ। লঙ্কাকাণ্ডের প্রাথমিক বীজবপন, কৈকেয়ীর ভুল বোঝার ভয়াবহ মুহূর্ত এবং কুবেরের কাছ থেকে রাবণের লঙ্কা ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিটি দৃশ্য দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে বাকরুদ্ধ করে বসিয়ে রাখে। অন্তত ‘আদিপুরুষ’-এর মতো রূপকথাকে বিকৃত করার মতো দুঃসাহস যে নির্মাতারা দেখাননি, তার জন্য ভারতীয় দর্শকেরা নিশ্চিতভাবেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন!
চোখের জল আর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের রাজসূয় যজ্ঞ:
{{/usCountry}}চোখের জল আর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের রাজসূয় যজ্ঞ:
{{/usCountry}}ডিএনইজি (DNEG)-এর অস্কারজয়ী ভিজ্যুয়াল টিম ৪,০০০ কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ ঢেলে দিয়েছে ছবির ভিএফএক্স (VFX)-এ। আর পর্দায় সেই খরচের প্রতিটি পাই-পয়সার জাদুকরী প্রমাণ মেলে। এটি শুধুই গ্রাফিক্সের খেলা নয়, প্রতিটি ফ্রেমে পরম যত্ন নিয়ে বুনে দেওয়া হয়েছে শৈল্পিক ছোঁয়া। হলিউডের ‘অবতার’-এর মতো যেকোনো মেগা প্রজেক্টের সাথে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এই ছবি।
ক্লাইম্যাক্স ও জটায়ুর দৃশ্য: ছবির আসল তাসের তাস হলো জটায়ুর যুদ্ধ। অনুপম খেরের কণ্ঠে বীর পাখি জটায়ু যখন সীতাকে বাঁচাতে রাবণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেই দৃশ্য দেখে গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য!
এ কে কেমন অভিনয় করলেন?
যশ (রাবণ): ছবির আসল বাজিমাত করেছেন যশ! ‘টক্সিক’-এর ব্যর্থতার পর রাবণের চরিত্রে তাঁর রাজকীয় হাঁটাচলা, অহংকারী দৃষ্টি এবং দশাননের নতুন রূপায়ণ পুরো ছবিকে একাই নিজের কাঁধে টেনেছেন।
রণবীর কাপুর (রাম): অ্যাকশন দৃশ্যে রণবীর স্বচ্ছন্দ হলেও, সেই আশির দশকে অরুণ গোভিল যে ভক্তি ও পরম শান্তির আবেশ তৈরি করেছিলেন, তা রণবীরের চোখে কিছুটা অনুপস্থিত। তবে কাকতালীয়ভাবে, রাজা দশরথের ভূমিকায় স্বয়ং অরুণ গোভিলের উপস্থিতি যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার এক অপূর্ব মিষ্টি মুহূর্ত তৈরি করে।
সাই পল্লবী (সীতা): পর্দায় আসবামাত্রই সাই পল্লবী তাঁর স্বাভাবিক মাধুর্য ও শালীনতা দিয়ে সীতা চরিত্রকে পূর্ণতা দিয়েছেন।
অন্যান্য চরিত্র: কৈকেয়ী হিসেবে লারা দত্ত এবং মন্থরার চরিত্রে শিবা চাড্ডা অসাধারণ। এক দৃশ্যেই শিবা প্রমাণ করেছেন কেন এই ঐতিহাসিক বাঁকের জন্য তিনিই একমাত্র পছন্দ ছিলেন। লক্ষ্মণ হিসেবে রবি দুবে তাঁর নিষ্ঠা ও উগ্র মেজাজের সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।
ঙ্গীতের জায়গায় কিছুটা খামতি:
হলিউডের হ্যান্স জিমার এবং ভারতের এ আর রহমানের মতো দুই সংগীত গুরু যখন হাত মেলান, তখন প্রত্যাশার পারদ থাকে আকাশে। তাঁদের সুর শুনতে ভালো লাগলেও, প্রত্যাশার সেই পর্বতপ্রমাণ মাপকাঠি স্পর্শ করতে পারেনি। কিছু জায়গায় অপ্রয়োজনীয় গান ছবির গতি কিছুটা শ্লথ করেছে।
শেষ কথা:
নিতেশ তিওয়ারির সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল ১৫০ কোটি মানুষের প্রত্যাশার! প্রথম পর্বের এই মহাকাব্যিক অভিযানে তিনি বিজয়ী। আসল বাজি তো সাজানো রয়েছে দ্বিতীয় পর্বের জন্য— যেখানে সানি দেওলের হনুমান অবতার, গন্ধমাদন পর্বত বহন এবং রাম-রাবণের সেই মহাযুদ্ধের অপেক্ষা!
রেটিং: ৪ / ৫ স্টার (★★★★☆)
এক কথায়: শৈল্পিক ভিজ্যুয়ালের মোড়কে চেনা রামায়ণের এক আবেগঘন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখা আবশ্যিক।