বলিউডের অন্যতম প্রতিভাবান ও ব্যতিক্রমী অভিনেত্রী সায়ামী খের (Saiyami Kher) তাঁর অভিনয় দক্ষতার জন্য প্রতিনিয়ত সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। 'মির্জ্যা', 'চোকড', '৮ এএম মেট্রো' থেকে শুরু করে আর বালকি পরিচালিত ক্রিকেটভিত্তিক ছবি 'ঘোমর' (Ghoomer)—প্রতিটি সিনেমাতেই নিজের সর্বস্ব দিয়ে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু বক্স অফিসের ব্যবসায়িক সাফল্য এবং একজন শিল্পীর প্রতি দর্শকের শ্রদ্ধাবোধের সমীকরণটি ঠিক কেমন? সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে খোলামেলা ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সায়ামী।

আর বালকি পরিচালিত 'ঘোমর' সিনেমায় একজন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী (এক হাত হারানো) নারী ক্রিকেটারের চরিত্রে সায়ামীর অভিনয় সমালোচকদের মুগ্ধ করেছিল। ছবিতে তাঁর সাথে অভিনয় করেছিলেন অভিষেক বচ্চন ও শাবানা আজমি। তবে থিয়েটারে সিনেমাটি বক্স অফিসে আশানুরূপ ব্যবসা করতে পারেনি। পরবর্তীকালে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-এ মুক্তি পাওয়ার পর এবং ইউটিউবে সাড়াজাগানোর পর দর্শকরা ছবিটিকে ব্যাপক ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন। ‘ঘোমর’-এর পেছনের এই অভিজ্ঞতা এবং বলিউডের বক্স অফিস-কেন্দ্রিক মানসিকতা নিয়ে সায়ামীর অকপট বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ‘ঘোমর’-এর বক্স অফিস ব্যর্থতা এবং ওটিটি-তে ঘুরে দাঁড়ানো
ইন্টারভিউতে 'ঘোমর' ছবির বক্স অফিস সাফল্য না পাওয়ার বিষাদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সায়ামী বলেন, “যখন আপনি একটি সিনেমার পেছনে নিজের মন-প্রাণ উজাড় করে দেন এবং ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশিত নম্বর তুলতে পারে না, তখন তা ভীষণ হতাশাজনক ও কষ্টদায়ক হয়।”
তবে কেন ছবিটি থিয়েটারে চলল না, সে বিষয়েও যুক্তি তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, “আমরা সিনেমাটি মুক্তির যে তারিখটি বেছে নিয়েছিলাম, সেটি সম্পূর্ণ ভুল ছিল। সেই সময়ে বক্স অফিসে একসাথে চার-চারটি বড় মাপের ছবি মুক্তি পেয়েছিল। প্রতিটা ছবির সাথেই নতুন অভিজ্ঞতা হয়। তবে আমার বিশ্বাস, ভালো মন নিয়ে তৈরি করা সিনেমা কোনো না কোনোভাবে ঠিক তার দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।”
প্রসঙ্গক্রমে সায়ামী জানান, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-এ স্ট্রিম হওয়ার পর আজও প্রতিদিন তাঁর কাছে ২৫ থেকে ৩০টি ভক্তের বার্তা আসে, যেখানে মানুষ ‘ঘোমর’ দেখে তাঁদের অনুভূতির কথা জানান।
২. ‘১০০০ কোটির ব্লকবাস্টার বনাম দর্শকের আসল সম্মান’
{{/usCountry}}প্রসঙ্গক্রমে সায়ামী জানান, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-এ স্ট্রিম হওয়ার পর আজও প্রতিদিন তাঁর কাছে ২৫ থেকে ৩০টি ভক্তের বার্তা আসে, যেখানে মানুষ ‘ঘোমর’ দেখে তাঁদের অনুভূতির কথা জানান।
২. ‘১০০০ কোটির ব্লকবাস্টার বনাম দর্শকের আসল সম্মান’
{{/usCountry}}বলিউডে আজকাল যেভাবে যেকোনো সিনেমার মান এবং একজন অভিনেতার ভবিষ্যৎ শুধুই তাঁর ১০০ কোটি বা ১০০০ কোটির বক্স অফিস কালেকশনের ওপর ভিত্তি করে বিচার করা হয়, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সায়ামী খের।
- হাজার কোটির ছবি শ্রদ্ধার গ্যারান্টি দেয় না: সায়ামী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, “এমন অনেক সিনেমা রয়েছে যা ১০০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে, কিন্তু ছবি দেখে বেরিয়ে দর্শক বলে—‘এটা কী সিনেমা বানিয়েছ!’ তারা হয়তো হলে গিয়ে ছবি দেখে ঠিকই, কিন্তু ১০০০ কোটির ছবি আপনাকে একজন শিল্পী হিসেবে আসল সম্মান বা শ্রদ্ধা এনে দেবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।”
- ‘৮ এএম মেট্রো’-র উদাহরণ: নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি ‘৮ এএম মেট্রো’ সিনেমার উদাহরণ টানেন। সায়ামী বলেন, “৮ এএম মেট্রো ছবিটি করার পর আমি যে পরিমাণ সম্মান পেয়েছি, তা অন্য কোনো ছবি থেকে পাইনি। অবাক করার বিষয় হলো, শুরুর দিকে এই সিনেমাটি কোনো বড় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম কিনতেই চাইছিল না! পরে এটি ইউটিউবে ব্লকবাস্টার হিট হওয়ার পর ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো কেনে। দর্শকই শেষ পর্যন্ত আসল রাজা এবং সেখান থেকেই একজন অভিনেতার প্রতি প্রকৃত সম্মান আসে।”
৩. বলিউডের 'বক্স অফিস কেন্দ্রিকতা' এবং পরিচালকদের আস্থা
বলিউডের ব্যবসাকেন্দ্রিক মনোভাব নিয়ে সায়ামী স্বীকার করেন যে, চলচ্চিত্র মূলত একটি ব্যবসাই। যদি প্রযোজকের টাকা ফেরত না আসে, তবে নতুন সিনেমা তৈরি হওয়া কঠিন। তবে এটি দুর্ভাগ্যজনক যে ইন্ডাস্ট্রিতে মেধার চেয়ে বক্স অফিসের টাকার অঙ্ক দেখে পরবর্তী কাজের সুযোগ মেলে।
তা সত্ত্বেও আর বালকির মতো প্রখ্যাত পরিচালকেরা তাঁর ওপর যেভাবে আস্থা রেখেছেন, সেটির জন্য নিজেকে কৃতজ্ঞ মনে করেন সায়ামী। তিনি জানান, “আর বালকি স্যার আমাকে পরিষ্কার বলেছিলেন—‘ঘোমর’-এর স্ক্রিপ্টটির সাথে সবচেয়ে বেশি বিচার আমিই করতে পারব। অন্য কোনো বড় এ-লিস্টার তারকাকে নিলে গল্পটার খাঁটি ভাব নষ্ট হয়ে যেত। বড় নির্মাতারা যখন এই ভরসাটুকু রাখেন, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।”
বর্তমানে যখন পুরো বলিউড বক্স অফিসের নম্বর ও ১০০০ কোটির ক্লাব নিয়ে মেতে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে সায়ামী খেরের এই বক্তব্য হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের কঠিন সত্যটিকে ফুটিয়ে তুলেছে। বাণিজ্যিক সাফল্য প্রয়োজন ঠিকই, তবে শেষ পর্যন্ত ভালো কনটেন্ট এবং নিখুঁত অভিনয়ই একজন শিল্পীকে দর্শকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী সম্মান এনে দেয়।