মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় বোধহয় সেটাই, যখন চারপাশের চেনা মুখগুলো একে একে মুখোশ খুলে আসল রূপটা দেখিয়ে দেয়। ঠিক তেমনই এক মারাত্মক মানসিক বিপর্যয়, একাকীত্ব এবং চরম ট্রোলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছেন ভ্লগার তথা অভিনেতা সায়ক চক্রবর্তী (Sayak Chakraborty)। নির্মম মানসিক আঘাত ও কটাক্ষের শিকার হয়ে যে মানুষটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, আজ তিনি সমস্ত বাধা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিলেন।

গত কয়েক মাসে আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছেন সায়ক, কখনও গো-মাংস বিতর্ক, কখনও আবার গায়িকা দেবলীনা নন্দীর দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার কারণ হিসাবে উঠে এসেছে তাঁর নাম। সায়কের প্রাক্তন বৌদি অভিনেত্রী সুস্মিতা তাঁকে সমকামী কটাক্ষে বিঁধেছেন। এতকিছুর পর সমাজ মাধ্যম থেকে বেশকিছুদিন দূরেও ছিলেন সায়ক।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও বিস্ফোরক পোস্ট করে নিজের জীবনের সেই অন্ধকার তিন মাসের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন সায়ক।
‘জানুয়ারি থেকে মার্চ, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছি’
নিজের এক বুক কষ্ট উগরে দিয়ে সায়ক জানান, বছরের শুরুর প্রথম তিনটি মাস তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময় ছিল। তিনি লেখেন: ‘জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ— এই ৩ মাসে নিজেকে অনেকবার শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছি। ভেবেছি আমি না থাকলেই হয়তো ভালো হতো। আমি আগে নিজের কথা ভাবতাম না, বন্ধুর বিপদে সবসময় পাশে থাকতাম। কাছের বন্ধুর সব সমস্যায় পাশে থেকেছি, আর আমি যখন নিজে সমস্যায় পড়লাম, সবাই লাথি মারতে থাকলো…’।
সায়ক আক্ষেপের সুরে জানান, এই কঠিন সময়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তিনি না থাকলে বাকি তথাকথিত বন্ধুদের কিচ্ছু যেত আসত না। তারা বড়জোর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দিয়ে দুটো লাইনের সান্ত্বনা বাক্য লিখত। কিন্তু আসল ক্ষতি হতো তাঁর পরিবারের।
{{/usCountry}}সায়ক আক্ষেপের সুরে জানান, এই কঠিন সময়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তিনি না থাকলে বাকি তথাকথিত বন্ধুদের কিচ্ছু যেত আসত না। তারা বড়জোর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দিয়ে দুটো লাইনের সান্ত্বনা বাক্য লিখত। কিন্তু আসল ক্ষতি হতো তাঁর পরিবারের।
{{/usCountry}}‘সারা জীবন কষ্ট বয়ে নিয়ে বেড়াত আমার মা ও দাদা’
আত্মহননের চিন্তা থেকে সায়ককে ফিরিয়ে এনেছে তাঁর পরিবার ও রক্তের সম্পর্ক। বন্ধুদের আসল রূপ চিনে যাওয়ার পর সায়কের উপলব্ধি, ‘এখন ভাবি আমি যদি না থাকতাম তাহলে কারুর কিচ্ছু যায় আসতো না, কিন্তু আমার পরিবার ভালো থাকতো না। পরিবার ছাড়া যাদের কাছের ভাবতাম, তাদের প্রত্যেককে চিনে গেছি এই ৩ মাসে। আমি না থাকলে আমার ছবি দিয়ে ২ লাইন লিখতো শুধু, আর সারা জীবন কষ্ট বয়ে নিয়ে বেড়াত আমার মা আর দাদা।’ গত কয়েক মাসে সায়কের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুকান্তর দূরত্ব বেড়েছে, তা এদিন জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল।
‘গে’, ‘হিজড়ে’, ‘ছক্কা’— কুৎসিত ট্রোলিংয়ের শিকার সায়ক
সোশ্যাল মিডিয়ায় একদল নেটিজেন ও কুৎসা রটনাকারীদের আক্রমণ যেন সায়কের পিছু ছাড়ছে না। সায়কের ব্যক্তিগত জীবন এবং সত্তা নিয়ে যেভাবে নোংরা কাদা ছোড়াছুড়ি করা হয়েছে, তার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি লেখেন, এখনও তাঁর জীবনে খারাপ মুহূর্ত আসে। লোকে রটাচ্ছে তিনি নাকি ‘বন্ধুর ঘর ভেঙেছেন’। এখানেই শেষ নয়, তাঁকে ‘Gay’ (সমকামী), ‘গরু খেকো’, ‘হিজড়ে’, কিংবা ‘ছক্কা’ বলে প্রকাশ্য রাস্তায় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কুৎসিতভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে।
‘করতে থাকো ট্রোল, আমি এগোতে থাকলাম’— ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
তবে এত আঘাত, অপমান আর নোংরামি সামলে সায়ক এখন মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্ত ও পরিণত। ট্রোলারদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সায়ক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যা সামলে তিনি এখনও বেঁচে আছেন, তারপর আর কোনো কিছুতেই তাঁর কিচ্ছু যায় আসে না। তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি: ‘সো করতে থাকো খারাপ মোমেন্ট আর আমি আমার জীবনে এগোতে থাকি।’
একটি জরুরি বার্তা: মানসিক অবসাদ বা আত্মহত্যার চিন্তা এলে একা থাকবেন না। আপনার পাশে আপনার পরিবার ও পেশাদার সহায়তাকারীরা রয়েছেন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কারও সাথে কথা বলুন বা হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন। আপনি একাকী নন।