সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সিনেমায় 'আলফা' বা 'হাইপারমাসকুলিন' (Hypermasculine) পুরুষ চরিত্রের এক বিরাট জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পর্দায় পুরুষ চরিত্র মানেই সেখানে উগ্রতা, চরম হিংসা, রক্তারক্তি এবং মারপিটকে এক প্রকার উদযাপনের মতো উপস্থাপন করা যেন এক নতুন ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। তবে এই উগ্র 'হাইপারমাসকুলিনিটি'-র ভিড়েও শান্ত, সংবেদনশীল এবং সূক্ষ্ম পুরুষালি চরিত্রের স্থান আজও সিনেমাজগতে অমলিন রয়েছে বলে মনে করেন বিশিষ্ট অভিনেতা সিদ্ধার্থ (Siddharth)।

সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারতীয় সিনেমায় পৌরুষ বা মাসকুলিনিটি (Masculinity)-র পরিবর্তনশীল ধারণা এবং এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনার কথা অকপটে ব্যক্ত করেছেন সিদ্ধার্থ। কারগিল যুদ্ধের বীর শহিদ স্কোয়াড্রন লিডার অজয় আহুজার জীবনভিত্তিক প্রজেক্ট ‘অপারেশন সাদা সাগর’ (Operation Safed Sagar)-এ অভিনয় প্রসঙ্গে এবং ভারতীয় সিনেমায় পুরুষ চরিত্রের উপস্থাপন নিয়ে তাঁর সেই ভাবনার বিশদ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ‘অপারেশন সাদা সাগর’ ও শহিদ স্কোয়াড্রন লিডার অজয় আহুজার চরিত্র
১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের বীর শহিদ স্কোয়াড্রন লিডার অজয় আহুজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিদ্ধার্থ। পর্দায় একজন দেশপ্রেমিক সৈনিক হওয়ার পাশাপাশি অজয় আহুজার শান্ত ও মার্জিত স্বভাবের রূপটি ফুটিয়ে তোলাকে এক পরম অভিজ্ঞতা বলে মনে করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে সিদ্ধার্থ বলেন, “আহুজা স্যারের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাওয়াটা আমার জন্য অনেক বড় এক পরম সৌভাগ্য ও সম্মানের। আমি দুটি প্রধান কারণে এই প্রজেক্টে সম্মত হয়েছিলাম—প্রথমত, এই প্রজেক্টটির পেছনে ভারতীয় বিমান বাহিনীর (Indian Air Force) পূর্ণ সমর্থন ছিল। ২৭ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক সামরিক অপারেশনের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে তারা সমস্ত সম্পদ ও অনুমতি দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছিল। আর দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, শহিদ অজয় আহুজার স্ত্রী অলকা ম্যাম নিজে এই কাজটির জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন। আমার কাছে এটি কেবল এক বীর সৈনিকের গল্প নয়, বরং এটি সমপরিমাণে এক সাধারণ মানুষের গল্প।”
২. ‘আমার ধরনের পৌরুষের জায়গা পর্দায় সবসময় থাকবে’
ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমানের হাইপারমাসকুলিন চরিত্রের দাপট থাকা সত্ত্বেও নিজের অবস্থান তুলে ধরে সিদ্ধার্থ জানান, “আমি আমার পুরো ক্যারিয়ারে সবকটি সিনেমাতেই একজন পুরুষের চরিত্রই ফুটিয়ে তুলেছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতেও সেটাই করে যাব। এ যাবৎকাল যদি ইন্ডাস্ট্রিতে আমার একটা নিজস্ব জায়গা থেকে থাকে, তবে ধরে নিতে হবে আমার ধাঁচের মার্জিত পুরুষালিপনার জায়গা সিনেমাজগতে সবসময় থাকবে। যেদিন আমার এই ভাবনার কোনো জায়গা থাকবে না, সেদিন আমার কাছে কাজের অফার আসাও বন্ধ হয়ে যাবে। পুরো বিষয়টাই নির্ভর করে একজন নির্মাতার সঠিক উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছার ওপর।”
{{/usCountry}}ইন্ডাস্ট্রিতে বর্তমানের হাইপারমাসকুলিন চরিত্রের দাপট থাকা সত্ত্বেও নিজের অবস্থান তুলে ধরে সিদ্ধার্থ জানান, “আমি আমার পুরো ক্যারিয়ারে সবকটি সিনেমাতেই একজন পুরুষের চরিত্রই ফুটিয়ে তুলেছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যতেও সেটাই করে যাব। এ যাবৎকাল যদি ইন্ডাস্ট্রিতে আমার একটা নিজস্ব জায়গা থেকে থাকে, তবে ধরে নিতে হবে আমার ধাঁচের মার্জিত পুরুষালিপনার জায়গা সিনেমাজগতে সবসময় থাকবে। যেদিন আমার এই ভাবনার কোনো জায়গা থাকবে না, সেদিন আমার কাছে কাজের অফার আসাও বন্ধ হয়ে যাবে। পুরো বিষয়টাই নির্ভর করে একজন নির্মাতার সঠিক উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছার ওপর।”
{{/usCountry}}তবে পর্দায় এ জাতীয় ভিন্ন ধারার হাইপারমাসকুলিন চরিত্র তৈরিকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখেন সিদ্ধার্থ। তিনি মনে করেন, অভিনেতারা চিত্রনাট্য অনুযায়ী সব ধরণের চরিত্রেই অভিনয় করতে পারেন। তবে কোনো কিছু ১০০% নিশ্চিত জানা থাকলে সেখানে ‘মার্ড কো ডার্ড নেহি হোতা’ (পুরুষ মানুষ কাঁদে না বা ব্যথা পায় না) টাইপের কাল্পনিক পৌরুষ দেখানো যায়। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতায় যেখানে পরের মুহূর্তে কী হতে চলেছে তা কারও জানা নেই, সেখানে মানুষের আত্মআবিষ্কার ও সততাই আসল গল্প তৈরি করে।
৩. তরুণ বীর যোদ্ধাদের ‘কামিং অফ এজ’ বা জীবনবোধের গল্প
‘অপারেশন সাদা সাগর’-এ প্রদর্শিত পৌরুষকে সিদ্ধার্থ অন্যান্য গতানুগতিক অ্যাকশন ছবির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখেছেন। তাঁর কথায়, এটি কেবল রক্তগরম করা হিংসার গল্প নয়, বরং কিছু উদীয়মান তরুণ ছেলেদের জীবনের গল্প।
তিনি যোগ করেন, “আমরা প্রায়শই পৌরুষ নিয়ে নানা তাত্বিক আলোচনা করি, কিন্তু এখানে গল্পটা কিছু কমবয়সী তরুণের। তারা ছিল ভারতীয় সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে সর্বকনিষ্ঠ এয়ার স্কোয়াড্রন, যারা রাতের অন্ধকারে এত উঁচুতে সবচেয়ে কঠিন মিলিটারি অপারেশন সফল করেছিল। আমার কাছে এই সিনেমাটি কেবল বীরত্ব বা পুরুষত্ব প্রদর্শনের যুদ্ধ নয়, বরং এটি তরুণ ছেলেদের আত্মআবিষ্কার ও মানসিক পরিণত হওয়ার (Coming-of-age) এক অদ্ভুত সুন্দর গল্প। ‘গোল্ডেন অ্যারোস’ স্কোয়াড্রনের যেভাবে রূপায়ণ করা হয়েছে, তাতে নিজেদের লক্ষ্য চেনার চমৎকার এক সৌন্দর্য রয়েছে।”
বর্তমানে যখন পুরো ভারতীয় cinema স্ক্রিনজুড়ে শুধু পেশীশক্তি আর উগ্র পৌরুষের উদযাপন চলছে, তখন অভিনেতা সিদ্ধার্থের এই দৃষ্টিভঙ্গি সিনেমাপ্রেমীদের ভিন্নভাবে ভাবতে শেখায়। উগ্রতার বাইরে গিয়ে শান্ত, সংবেদনশীল এবং বাস্তবসম্মত উপায়েও যে পর্দায় বীরত্ব ও পুরুষত্বকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, সিদ্ধার্থের অভিনয় এবং ভাবনা তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।