নিজের মতামত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বর্তমানে সরা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন। তাঁর এই লেখার কারণেই একসময় নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছিলেন। এখনো বাংলাদেশে পা রাখার অধিকার নেই তাঁর। বর্তমানে তিনি সুইডেনের নাগরিক, এবং দিল্লির বাসিন্দা। প্রায় ১৯ বছর পর চলতি বছরের জুলাই মাসে বিজেপি সরকারের আমলে পা রাখেন কলকাতায়। প্রাক্তন তৃণমূল সরকার ও তারও আগের বাম সরকারের নামে করছেন ভুরি ভুরি অভিযোগ। আর এবার তসলিমা তাঁর একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে ফের একবার বামপন্থীদের নিয়ে করলেন বিস্ফোরক পোস্ট।

তসলিমা লেখেন, ‘বাংলাদেশের বামপন্থী তরুণ নেতা মেঘমল্লার বসুকে নিয়ে আমি ফেসবুকে কত লিখেছি! তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছি, তাঁর ওপর মৌলবাদীদের আক্রমণের প্রতিবাদ করেছি, এমনকি একদিন তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখতে চাই বলেছি। সেই মেঘমল্লারই এখন আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন। প্রাক্তন নকশাল প্রশান্ত রায় সাতাশ বছর ধরে আমার প্রকাশক। শুধু প্রকাশক নন, আপন দাদার মতো, আত্মীয়ের মতো কাছের মানুষ। তিনিও এখন আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গেও আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল। তিনিও বাজে কথা বলছেন। হঠাৎ কী হলো এঁদের? আমার বিরুদ্ধে এত বিষ কেন? আমার অপরাধটা কী?’
তসলিমার দাবি তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এটাই মানতে পারছেন না বামেরা। লেখেন, ‘একজন ধর্মনিরপেক্ষ নারীবাদী লেখককে বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়েছিল। উনিশ বছর পর সেই লেখককেই স্বাগত জানিয়েছে একটি বিজেপি সরকার। এই রাজনৈতিক বৈপরীত্য তাঁদের আত্মমূর্তিতে আঘাত করেছে। তাই নিজেদের ব্যর্থতার মুখোমুখি না হয়ে তাঁরা আমাকে বিজেপির লোক বানাতে ব্যস্ত। কিন্তু আমার ভাষণটি নিয়ে তাঁরা একটি কথাও বলছেন না কেন? আমার ভাষণের একটি বাক্য উদ্ধৃত করে দেখান, কোথায় আমি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছি। কোথায় আমি আমার আদর্শ থেকে এক ইঞ্চি সরে গেছি? কোথায় আমি ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর সমানাধিকার, মানববাদ, যুক্তিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেছি?’
‘বামফ্রন্ট সরকার আমাকে আমার প্রিয় শহর থেকে তাড়িয়েছিল। যে কলকাতাকে ভালোবেসে ইউরোপ-আমেরিকার জীবন ছেড়ে আমি বাস করতে এসেছিলাম, সেই কলকাতা থেকে আমাকে রাতারাতি নির্বাসিত করা হয়েছিল। তারপর কেটে গেল উনিশ বছর। আমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বামপন্থীরা কী করেছিলেন? ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন? ক্ষমতা হারানোর পর কোনও নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন? কোনও সভা, মিছিল, আবেদন বা প্রতিবাদ করেছিলেন? একবারও কি বলেছিলেন—একজন বাঙালি লেখকের বাংলায় বাস করার, নিজের প্রিয় শহরে ফেরার অধিকার আছে? না, কিছুই করেননি। তাঁরা চেয়েছিলেন, আমাকে যে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আমি সেখানেই নিঃশব্দে পড়ে থাকি। বিস্মৃত হই। আমার কণ্ঠ মানুষের কাছে আর না পৌঁছোক। তাঁরা আমাকে ফিরিয়ে আনবেন না, অন্য কেউ ফিরিয়ে আনলে সেটিও সহ্য করবেন না—এ কেমন রাজনীতি?’, আরও লেখেন তসলিমা।
{{/usCountry}}‘বামফ্রন্ট সরকার আমাকে আমার প্রিয় শহর থেকে তাড়িয়েছিল। যে কলকাতাকে ভালোবেসে ইউরোপ-আমেরিকার জীবন ছেড়ে আমি বাস করতে এসেছিলাম, সেই কলকাতা থেকে আমাকে রাতারাতি নির্বাসিত করা হয়েছিল। তারপর কেটে গেল উনিশ বছর। আমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বামপন্থীরা কী করেছিলেন? ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন? ক্ষমতা হারানোর পর কোনও নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন? কোনও সভা, মিছিল, আবেদন বা প্রতিবাদ করেছিলেন? একবারও কি বলেছিলেন—একজন বাঙালি লেখকের বাংলায় বাস করার, নিজের প্রিয় শহরে ফেরার অধিকার আছে? না, কিছুই করেননি। তাঁরা চেয়েছিলেন, আমাকে যে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, আমি সেখানেই নিঃশব্দে পড়ে থাকি। বিস্মৃত হই। আমার কণ্ঠ মানুষের কাছে আর না পৌঁছোক। তাঁরা আমাকে ফিরিয়ে আনবেন না, অন্য কেউ ফিরিয়ে আনলে সেটিও সহ্য করবেন না—এ কেমন রাজনীতি?’, আরও লেখেন তসলিমা।
{{/usCountry}}সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তাঁকে কলকাতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিল ছোট একটি সংগঠন—সেক্যুলার মিশন। পরে যুক্ত হয়েছিল আরও দুটি ছোট সংগঠন—‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ এবং হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন। সেই নাগরিক উদ্যোগকেই স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি সরকার। সপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়েছে। ডানপন্থীরা প্রকাশ্যে তাঁর পশ্চিমবঙ্গে ফেরার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। তবে এতে তিনি কখনো ডানপন্থী হয়ে যান না।
নিজের পোস্টের একটি অংশে তসলিমা লেখেন, ‘আজ অশিক্ষিত জিহাদিরা আমার বিরুদ্ধে যে ভাষায় অপপ্রচার চালাচ্ছে, শিক্ষিত বামপন্থীদের একাংশও প্রায় একই ভাষায় একই বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। আমি বলছি না, জিহাদি আর বামপন্থী একই মতাদর্শের মানুষ। কিন্তু একজন ধর্মনিরপেক্ষ নারীবাদী লেখককে আক্রমণ করতে গিয়ে যখন দুই পক্ষ একই মিথ্যা, একই কুৎসা এবং একই ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করে, তখন তাদের ভাষার মধ্যে নৈতিক পার্থক্যটি কোথায় থাকে?’ সঙ্গে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘পশ্চিমবঙ্গ কোনও রাজনৈতিক দলের জমিদারি নয়। কলকাতাও নয়। পশ্চিমবঙ্গ মানুষের, কলকাতা মানুষের। সেই মানুষের ভালোবাসায় আমি ফিরেছি। আবারও ফিরব।’