বাংলা থিয়েটারের মুক্তমঞ্চ থেকে শুরু করে বিকল্প ধারার নাট্য আন্দোলন— এক যুগের অবসান ঘটল। দীর্ঘ দিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগার পর শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা ও নাট্যকার পঙ্কজ মুন্সী। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন সংস্কৃতির আঙিনার এই প্রতিবাদী মুখ।

বিকল্প থিয়েটার ও বাদল সরকারের নাট্যধারা:
কলকাতার মূলধারার থিয়েটারের পাশাপাশি যে বিকল্প পথ তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন পঙ্কজ মুন্সী। সত্তরের দশকে প্রখ্যাত নাট্যকার বাদল সরকারের হাত ধরে গড়ে ওঠা থার্ড থিয়েটার বা মুক্তমঞ্চের পরিবেশনায় তিনি ছিলেন এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব। কেবল অভিনয় নয়, বিকল্প থিয়েটারের ব্যবহারিক ও তত্ত্বীয় দিক গঠনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
রুপোলি পর্দা থেকে মঞ্চে স্বাক্ষর:
মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে সিনেমা ও পর্দাতেও তিনি রেখে গিয়েছেন তাঁর গভীর অভিনয় ছাপ। 'বাদল সরকার অ্যান্ড দ্য অল্টারনেটিভ থিয়েটার': পরিচালক অশোক বিশ্বনাথনের এই চর্চিত প্রামাণ্যচিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় ও বক্তব্য বিকল্প থিয়েটারের একটা দলিল হয়ে রয়ে গিয়েছে।
বড় পর্দায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এবং ‘শজারুর কাঁটা’-র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছিল। পরিচালক অয়ন চক্রবর্তী প্রয়াত পঙ্কজ বাবুকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে লেখেন, 'বছর দুই আগে। একটা ওয়েব সিরিজের শুট শুরুর প্রস্তুতি চলছে। আমার এক সহকারী বলল, 'পঙ্কজবাবু তোমার নাম্বার চাইছেন, দেব?' সম্মতি জানালাম। যে সিরিজের প্রস্তুতি চলছিল, তাতেই একটা চরিত্রে অভিনয় করার কথা তাঁর। জানতাম যে ওঁর সিনগুলোর স্ক্রিপ্ট পেয়ে গেছেন উনি। ভাবলাম, সেই নিয়েই কিছু আলোচনা করবেন।
ফোন করলেন। বললেন, 'অয়নবাবু, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দু:খিত। কিন্তু বয়স হয়েছে তো, সংযম কমেছে। ইদানিং লোভ সামলাতে কষ্ট হয়।' কথা বলে জানলাম, নিজের সিনগুলো পড়ে পুরো স্ক্রিপ্টটা পড়ার ইচ্ছে হয়েছে তাঁর, তাই ঐ ফোন।
{{/usCountry}}ফোন করলেন। বললেন, 'অয়নবাবু, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দু:খিত। কিন্তু বয়স হয়েছে তো, সংযম কমেছে। ইদানিং লোভ সামলাতে কষ্ট হয়।' কথা বলে জানলাম, নিজের সিনগুলো পড়ে পুরো স্ক্রিপ্টটা পড়ার ইচ্ছে হয়েছে তাঁর, তাই ঐ ফোন।
{{/usCountry}}তারপর আরো আরো দীর্ঘ কথোপকথন হয়েছে, এই প্রান্তে আমি 'অয়নবাবু, আপনি' থেকে 'অয়ন, তুমি' হয়েছি। ঐ প্রান্তে উনি 'পঙ্কজবাবু, আপনি' থেকে 'পঙ্কজদা, আপনি' হয়েছেন। শরীর অশক্ত হয়েছিল, শ্রবণশক্তি কিঞ্চিৎ দুর্বল হয়েছিল, কিন্তু অভিনয়প্রতিভা ছিল অমলিন, নিষ্ঠা ছিল অটুট, কাজের খিদে ছিল অপরিসীম। মারা গেলেন পঙ্কজ মুন্সী। শিখিয়ে গেলেন অনেক কিছু।'
অভিনেতা দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত প্রয়াত অভিনেতাকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে লেখেন, 'আবার একটা ছায়া হারানোর দিন… কতই বা বয়স আমার তখন, সাত কি আট, ঋণশোধ নাটকে অভিনয়, আপনার নির্দেশনায়। অন্য লোকে ভালো থাকুন পঙ্কজ কাকু'।
সংস্কৃতি জগতের এই অভিভাবকসম ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে শোকাতুর টলিপাড়া থেকে শুরু করে নাট্যমঞ্চ। তাঁর সহধর্মিণী, খ্যাতনামা অভিনেত্রী তপতী মুন্সী এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন সহকর্মীরা। প্রদীপের আলো নিভে এলেও মুক্তমঞ্চের মেঠো হাওয়ায় পঙ্কজ মুন্সীর নাম থেকে যাবে চির ভাস্বর।