টানটান উত্তেজনার কোনো সিনেমা দেখা, পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তা করা কিংবা অফিসে কাজের মাঝে আনমনে বসে থাকা—এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই না জেনে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে শুরু করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় অবচেতন মনে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানোর এই অভ্যাসকে বলা হয় ‘অনিকোফ্যাগিয়া’ (Onychophagia)। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—বহু মানুষের মধ্যেই এই অভ্যাসটি দেখা যায়।

আপাতদৃষ্টিতে এটিকে কেবল একটি সাধারণ বা ক্ষতিকর অভ্যাস মনে হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে এটি অত্যন্ত মারাত্মক একটি স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত ভুল। হাতের নখের নিচে থাকা অদৃশ্য জীবাণু দাঁত দিয়ে নখ কাটার সময় সরাসরি আমাদের মুখে ও পেটে প্রবেশ করে শরীরের নানাবিধ অপূরণীয় ক্ষতি করে। দাঁত দিয়ে নখ কাটার প্রধান কুফল এবং এই বিপজ্জনক অভ্যাস থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. দাঁত দিয়ে নখ কাটার প্রধান শারীরিক ঝুঁকি ও ক্ষতি
ক) পেটে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রামন ও পেটের রোগ:
আমাদের হাত সারাদিন নানা জায়গায় স্পর্শ করে। ফলে নখের খাঁজে ও নিচে জমা হয় ই. কোলাই (E. coli), সালমোনেলা (Salmonella)-র মতো কোটি কোটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও কৃমির ডিম। দাঁত দিয়ে যখনই নখ কামড়ানো হয়, তখন ওই জীবাণুগুলো সরাসরি লালার সাথে মিশে পেটে চলে যায়। এর ফলে ঘন ঘন পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি এবং অন্ত্রের ফুড পয়জনিংয়ের মতো জটিলতা দেখা দেয়।
খ) দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির মারাত্মক ক্ষতি:
{{/usCountry}}খ) দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির মারাত্মক ক্ষতি:
{{/usCountry}}নখ বেশ শক্ত একটি উপাদান। অনবরত দাঁত দিয়ে নখ কাটলে দাঁতের ওপরের রক্ষাকবচ অর্থাৎ এনামেল (Enamel) চিরতরে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। এর ফলে দাঁত স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে (Sensitvity) এবং সহজে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া নখের ধারালো অংশ মাড়িতে ঢুকে গিয়ে মাড়ি ছিঁড়ে যেতে পারে এবং মাড়ির গভীরে ইনফেকশন হতে পারে।
গ) নখ ও আঙুলের মারাত্মক সংক্রমণ (Paronychia):
দাঁত দিয়ে নখ কাটার সময় প্রায়শই নখের চারপাশের চামড়া ও কিউটিকেল (Cuticle) ছিঁড়ে রক্ত বের হয়। থুতু ও মুখের লালায় থাকা জীবাণু যখন সেই খোলা ক্ষতে প্রবেশ করে, তখন আঙুলে ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক সংক্রমণ ঘটে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘প্যারোনিকিয়া’ (Paronychia) বলা হয়। এর ফলে আঙুল ফুলে লাল হয়ে পুঁজ জমে যায়।
ঘ) চোয়ালের সমস্যা ও স্থায়ী বিকৃতি (TMJ Disorder):
ক্রমাগত নখ কামড়ানোর সময় চোয়ালকে একপাশে অস্বাভাবিকভাবে চাপ দিতে হয়। দীর্ঘদিন এভাবে চললে চোয়ালের জয়েন্ট অর্থাৎ ‘টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট’ (TMJ)-এর ক্ষতি হয়, যার ফলে মুখ খুলতে বা খাবার চিবোতে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
২. দাঁত দিয়ে নখ কাটার অভ্যাস বদলানোর সহজ উপায়
- নিয়মিত নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখা: নখ বড় থাকলে কামড়ানোর প্রবণতা বাড়ে। তাই নেল কাটার দিয়ে নিয়মিত নখ ছোট ও মসৃণ করে কেটে রাখুন।
- তিক্ত স্বাদের নেলপলিশ ব্যবহার: বাজারে বা ফার্মেসিতে পাওয়া বিশেষ তেঁতো স্বাদের ‘অ্যান্টি-নেইল বাইটিং’ নেলপলিশ নখে লাগিয়ে রাখতে পারেন। দাঁতে নখ দিলেই তেঁতো স্বাদের কারণে অনায়াসে হাত মুখ থেকে সরে আসবে।
- চাপ কমানো ও স্ট্রেস বল ব্যবহার: উদ্বেগ বা মানসিক চাপের কারণে নখ কাটার অভ্যাস থাকলে দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য 'স্ট্রেস বল' বা 'ফিজেট স্পিনার' হাতে রাখতে পারেন।
- গ্লাভস বা ব্যান্ডেজ ব্যবহার: খুব বেশি সমস্যা হলে কাজ করার সময় আঙুলে পাতলা ব্যান্ডেজ বা গ্লাভস পড়ে থাকার অভ্যাস করতে পারেন।
দাঁত দিয়ে নখ কাটা কেবল সৌন্দর্যের হানি ঘটায় না, বরং নিজের অজান্তেই শরীরে একাধিক মারাত্মক রোগ ডেকে আনে। নিজের ও পরিবারের সুস্থতার কথা ভেবে আজই এই ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার করুন।