পারমিতা কাঞ্জিলাল চক্রবর্তী (কনসালটেন্ট - এমার্জেন্সি মেডিসিন, মণিপাল হাসপাতাল, সল্টলেক)

দীপাবলি মানেই আলোর উৎসব, আনন্দ, পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে জমকালো মুহূর্ত কাটানো। তবে এই উৎসবের দিনগুলিতে বাজি পোড়ানো, অতিরিক্ত প্রদীপ প্রজ্বলন, মোমবাতি জ্বালানো এবং ঘর সাজানোর নানান আয়োজনের কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে। সামান্য অসাবধানতা ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের বিপদ। তাই উৎসবের আনন্দ যাতে বিষাদে না বদলায়, তার জন্য প্রয়োজন সঠিক সতর্কতা, প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং কিছু জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
১) পুড়ে গেলে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা এবং করণীয়
বাজি ফাটানোর সময় হাত বা শরীরের কোনও অংশ পুড়ে গেলে দেরি না করে দ্রুত কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
ঠান্ডা জলের ব্যবহার: পোড়া স্থানটি সঙ্গে সঙ্গে তাপের উৎস থেকে দূরে সরিয়ে নিন এবং অন্তত ২০ মিনিট ধরে ঠান্ডা ও প্রবহমান জলের নিচে রাখুন।
আসবাব বা অলংকার খোলা: ফোলা শুরু হওয়ার আগেই পোড়া জায়গার কাছাকাছি থাকা আংটি, ঘড়ি বা টাইট জামাকাপড় খুলে ফেলুন। তবে খেয়াল রাখবেন, কাপড় যদি ত্বকের সঙ্গে লেগে যায় তবে জোর করে টানবেন না।
ড্রেসিং করা: ত্বক ঠান্ডা হওয়ার পর একটি পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত, সুতোর আঁশহীন ভেজা কাপড় বা ড্রেসিং দিয়ে পোড়া স্থানটি হালকাভাবে ঢেকে দিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশুদ্ধ পেট্রোলিয়াম জেলি বা অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।
যা করা যাবে না: পোড়া স্থানে ভুলেও বরফ, টুথপেস্ট, মাখন, তেল, হলুদ বা অন্য কোনো ঘরোয়া টোটকা লাগাবেন না। ফোসকা পড়লে তা ফাটাবেন না বা পোড়া চামড়া টেনে তুলবেন না। মুখ, হাত, পা বা জয়েন্টের গভীর ক্ষত হলে বা ফোসকা পড়লে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত হাসপাতালে যান।
২) চোখের আঘাত: ঘষাঘষি করা থেকে বিরত থাকুন
বাজির ফুলকি, রাসায়নিক কণা এবং ধুলোবালি চোখে ঢুকে গেলে কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে এবং মারাত্মক ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তিও হারাতে পারে। চোখে কোনো কণা পড়লে পরিষ্কার জল দিয়ে আলতো করে ধুয়ে ফেলুন। তবে চোখে তীব্র ব্যথা, রক্তপাত, ঝাপসা দেখা বা আঘাতের আশঙ্কা থাকলে চোখে হাত দেবেন না বা চাপ দেবেন না। সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসকের কাছে যান।
{{/usCountry}}বাজির ফুলকি, রাসায়নিক কণা এবং ধুলোবালি চোখে ঢুকে গেলে কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে এবং মারাত্মক ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তিও হারাতে পারে। চোখে কোনো কণা পড়লে পরিষ্কার জল দিয়ে আলতো করে ধুয়ে ফেলুন। তবে চোখে তীব্র ব্যথা, রক্তপাত, ঝাপসা দেখা বা আঘাতের আশঙ্কা থাকলে চোখে হাত দেবেন না বা চাপ দেবেন না। সঙ্গে সঙ্গে জরুরি চিকিৎসকের কাছে যান।
{{/usCountry}}যা করবেন না: আক্রান্ত চোখ কচলাতে থাকবেন না, চোখের ভিতরে ঢুকে যাওয়া কোনো কণা বের করার চেষ্টা করবেন না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চোখের ড্রপ বা মলম ব্যবহার করবেন না। আঘাতপ্রাপ্ত চোখের ওপর সরাসরি কোনো কাপড় বা ব্যান্ডেজ চেপে ধরবেন না।
৩) নবজাতক ও প্রবীণদের ধোঁয়া থেকে রক্ষা করা
বাজির ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকারক রাসায়নিক কণা ও সূক্ষ্ম কণা শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে নবজাতক, শিশু এবং হাঁপানি বা সিওপিডি (COPD)-তে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য এই ধোঁয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফলে কাশি, শ্বাসকষ্ট, দমবন্ধ ভাব হতে পারে এবং বিদ্যমান অসুস্থতার অবনতি ঘটতে পারে।
— শিশুদের বাজি পোড়ানোর জায়গা থেকে দূরে ঘরে রাখুন। বাইরে অতিরিক্ত ধোঁয়া থাকলে দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন।
— শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
যা করবেন না: নবজাতকদের আতসবাজির ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসতে দেবেন না—এমনকী অল্প সময়ের জন্যও নয়। এছাড়া ঘরের ভিতর ধূপ, মশার কয়েল বা ধোঁয়া তৈরি করে, এমন অন্য কোনো সামগ্রী ব্যবহার করবেন না। শিশুদের ক্ষেত্রে কাপড়ের মাস্ক যথেষ্ট সুরক্ষা দেয়—এমনটা মনে করবেন না। শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করলে, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়লে অথবা ঠোঁট নীল হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ বিভ্রান্তি দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
৪) পতন, দুর্ঘটনা এবং বৈদ্যুতিক শক রোধে সতর্কতা
সাজসজ্জার বৈদ্যুতিক লাইটিং, এক্সটেনশন কর্ড, প্রদীপ বা মোমবাতি থেকে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। হাঁটার রাস্তার ধারে বৈদ্যুতিক তার ফেলে রাখবেন না। প্রদীপগুলি পর্দা বা আসবাবপত্র থেকে দূরে রাখুন। প্রবীণরা যেন নন-স্লিপ বা আরামদায়ক জুতো পরেন সেদিকে খেয়াল রাখুন। বৈদ্যুতিক শক লাগলে খালি হাতে কাউকে না ছুঁয়ে প্রথমে মেইন সুইচ বন্ধ করুন এবং দ্রুত চিকিৎসকের সাহায্য নিন।
৫) বাজি ফাটানোর সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা
সবসময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও অনুমোদিত দোকান থেকে বাজি কিনুন। উন্মুক্ত স্থানে বাজি পোড়ান এবং সবসময় বড়দের তত্ত্বাবধানে শিশুদের রাখুন। কাছে সবসময় এক বালতি জল বা বালি রাখুন। যে বাজিটি জ্বলেনি, সেটিতে পুনরায় আগুন লাগানোর চেষ্টা করবেন না। সিন্থেটিক বা ঢিলেঢালা পোশাক পরে বাজি ফাটানো থেকে বিরত থাকুন।
বাজি পোড়ানোর সময় একটি প্রাথমিক ফার্স্ট-এইড কিট হাতের কাছে রাখুন, যার মধ্যে জীবাণুমুক্ত গজ, পরিষ্কার ড্রেসিং সামগ্রী এবং স্যালাইন যেন থাকে। জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বরগুলো সংরক্ষণ করে রাখুন এবং আপনার নিকটস্থ কোন হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা সেবা রয়েছে তা জেনে রাখুন। গুরুতর পুড়ে যাওয়া, চোখে আঘাত, শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত রক্তপাতের মতো পরিস্থিতিতে ঘরোয়া প্রতিকারের আশায় সময় নষ্ট করবেন না, বরং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিন।
মনে রাখবেন, সচেতনতাই পারে একটি প্রাণবন্ত ও নিরাপদ উৎসব উপহার দিতে। পরিবার ও প্রিয়জনদের সুরক্ষায় একটু সতর্কতা অবলম্বন করলেই দীপাবলি হয়ে উঠতে পারে সত্যিকারের আলোর উৎসব।