প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাঁত মাজা আমাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। দাঁত ও মাড়ি সুস্থ রাখতে, মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে এবং দাঁতের ক্ষয় রোধ করতে নিয়মিত ব্রাশ করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা অনেকেই যে জিনিসটি দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করছি, অর্থাৎ আমাদের সাধের 'টুথব্রাশ'-এর স্বাস্থ্যের দিকে একদমই নজর দিই না।

অনেকেরই স্বভাব হলো, একটি টুথব্রাশ কিনে সেটি মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার করা। যতক্ষণ না ব্রাশের ব্রিসল বা রোঁয়াগুলো সম্পূর্ণ বেঁকে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়, ততক্ষণ ব্রাশ বদলানোর কথা আমাদের মাথাতেই আসে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দন্ত চিকিৎসকদের মতে, এই সাধারণ ভুল অভ্যাসটি আপনার দাঁত ও মাড়ির অপূরণীয় ক্ষতি করছে। একটি টুথব্রাশ ঠিক কত দিন ব্যবহার করা উচিত এবং পুরনো টুথব্রাশ ব্যবহারের মারাত্মক ক্ষতিকর দিকগুলো কী কী, তা নিয়ে একটি বিস্তারিত স্বাস্থ্য ও ওরাল হাইজিন সংক্রান্ত বিষয় জেনে নিন।
১. টুথব্রাশ বদলানোর সঠিক সময়সীমা কী?
আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (ADA) এবং বিশ্বজুড়ে দন্ত চিকিৎসকদের সর্বসম্মত সুপারিশ হলো—প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস অন্তর টুথব্রাশ বা ইলেকট্রিক টুথব্রাশের হেড অবশ্যই বদলে ফেলা উচিত।
আমরা যখন প্রতিদিন দু'বেলা ব্রাশ করি, তখন ব্রাশের ব্রিসলগুলো দাঁতের ঘর্ষণে ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্ষমতা ও নমনীয়তা হারাতে থাকে। ৩-৪ মাস পর ব্রাশের রোঁয়াগুলো এমনভাবে বেঁকে বা খসখসে হয়ে যায় যে, তা দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা প্লাক (Plaque) বা জীবাণু পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়। তাই ব্রাশ দেখতে ভালো লাগলেও ৩-৪ মাস পার হয়ে গেলে সেটি ফেলে দেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
২. পুরনো টুথব্রাশ ব্যবহারের মারাত্মক ক্ষতিকর দিক
ক) দাঁতে প্লাক ও টারটার জমা: পুরনো ব্রাশের বেঁকে যাওয়া ব্রিসল দাঁতের কোণা থেকে খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করতে পারে না। ফলে দাঁতে হলদেটে প্লাক জমতে শুরু করে, যা পরে শক্ত হয়ে 'টারটার'-এ পরিণত হয়। এর থেকে দাঁতে ক্যাভিটি বা পোকা লাগার সমস্যা দেখা দেয়।
{{/usCountry}}ক) দাঁতে প্লাক ও টারটার জমা: পুরনো ব্রাশের বেঁকে যাওয়া ব্রিসল দাঁতের কোণা থেকে খাবারের কণা ও ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করতে পারে না। ফলে দাঁতে হলদেটে প্লাক জমতে শুরু করে, যা পরে শক্ত হয়ে 'টারটার'-এ পরিণত হয়। এর থেকে দাঁতে ক্যাভিটি বা পোকা লাগার সমস্যা দেখা দেয়।
{{/usCountry}}খ) মাড়ি থেকে রক্তপাত ও সংক্রমণ: পুরনো ও ক্ষয়ে যাওয়া ব্রিসলগুলো অনেক বেশি রুক্ষ হয়ে যায়। এই রুক্ষ ব্রিসল দিয়ে জোরে ব্রাশ করলে মাড়ির নরম টিস্যু ছিলে যায়। এর ফলে মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া এবং 'জিঞ্জিভাইটিস' (Gingivitis) বা মাড়ির মারাত্মক প্রদাহ দেখা দেয়।
গ) ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের আস্তানা: বাথরুমের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রাখা টুথব্রাশে এমনিতেই ব্যাকটেরিয়া জমে। একটি ব্রাশ মাসের পর মাস ব্যবহার করলে তার গোড়ায় লাখ লাখ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও জীবাণু বাসা বাঁধে। এই জীবাণুযুক্ত ব্রাশ মুখে দিলে পেটের সমস্যা থেকে শুরু করে মুখের ঘা (Mouth Ulcer) হতে পারে।
৩. তিন মাসের আগেও কখন টুথব্রাশ বদলানো বাধ্যতামূলক?
কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ৩-৪ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই টুথব্রাশ বদলে ফেলা অত্যন্ত জরুরি:
- অসুস্থতার পর: যদি আপনার ভাইরাল জ্বর, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা, ফ্লু বা মুখের কোনো ইনফেকশন হয়ে থাকে, তবে সুস্থ হওয়ার পরপরই পুরনো ব্রাশটি ফেলে দেওয়া উচিত। পুরনো ব্রাশে ভাইরাসের জীবাণু বেঁচে থাকতে পারে, যা আপনাকে পুনরায় অসুস্থ করে তুলতে পারে।
- ব্রিসল নষ্ট হয়ে গেলে: অনেকেই খুব চেপে বা জোরে ব্রাশ করেন। এর ফলে ১-২ মাসের মধ্যেই ব্রাশের রোঁয়া বেঁকে বা ছড়িয়ে যায়। এমন হলে ৩ মাসের অপেক্ষা না করে সাথে সাথেই ব্রাশ বদলানো উচিত।
- বাচ্চাদের ক্ষেত্রে: শিশুদের দাঁত ও মাড়ি অত্যন্ত নরম হয় এবং তারা ব্রাশ চিবোতে ভালোবাসে। তাই শিশুদের টুথব্রাশ সাধারণত বড়দের চেয়ে অনেক দ্রুত নষ্ট হয়। শিশুদের ব্রাশ প্রতি ২ মাস অন্তর বদলে দেওয়া ভালো।
- অন্য কেউ ব্যবহার করলে: ভুলবশত যদি আপনার ব্রাশ পরিবারের অন্য কোনো সদস্য ব্যবহার করে ফেলেন, তবে তা আর ব্যবহার করবেন না। একজনের মুখের লালা ও ব্যাকটেরিয়া অন্যজনের শরীরে গেলে দ্রুত রোগ ছড়াতে পারে।
৪. টুথব্রাশের সঠিক যত্ন কীভাবে নেবেন?
শুধু সময়মতো ব্রাশ বদলালেই হবে না, ব্রাশের সঠিক যত্ন নেওয়াও সমান জরুরি:
- খোলা বাতাসে শুকানো: ব্রাশ করার পর জলের তোড়ে ব্রাশটি খুব ভালো করে ধুয়ে নিন যাতে কোনো টুথপেস্ট বা খাবারের কণা লেগে না থাকে। এরপর ব্রাশটি সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখুন যাতে খোলা বাতাসে দ্রুত শুকিয়ে যায়।
- কভার ব্যবহার না করা: ভেজা ব্রাশ কখনোই সাথে সাথে ক্যাপ বা কভার দিয়ে ঢেকে রাখবেন না। বদ্ধ ভেজা পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া সবচেয়ে বেশি বংশবৃদ্ধি করে।
- কমোড থেকে দূরে রাখা: বাথরুমে যদি কমোড থাকে, তবে ব্রাশ তার থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখুন। ফ্লাশ করার সময় তৈরি হওয়া জীবাণুকণা বাতাসে উড়ে ব্রাশে জমতে পারে।
দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝতে হলে টুথব্রাশের প্রতি যত্নশীল হওয়া সবচেয়ে জরুরি। মাত্র কয়েক টাকার একটি নতুন টুথব্রাশ আপনাকে ভবিষ্যতে হাজার হাজার টাকার ডেন্টাল চিকিৎসা এবং অসহ্য দাঁতের যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে পারে।