ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান ও নীরবে ছড়িয়ে পড়া দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা। একে প্রায়শই চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সাইলেন্ট কিলার’ (Silent Killer) বলা হয়, কারণ রোগটি শরীরে দানা বাঁধলেও প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। রক্তে সুগারের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তা ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র, কিডনি, চোখ, স্নায়ু এবং রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে। এই নীরব ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার একমাত্র ও সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা বা ব্লাড সুগার টেস্ট করানো।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কত দিন পর পর বা ঠিক কত দিন অন্তরালে এই পরীক্ষা করানো উচিত? উত্তরটি কিন্তু সবার জন্য এক নয়; এটি নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, পারিবারিক ইতিহাস এবং তিনি আগে থেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কি না তার ওপর। কত দিন পর পর কার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো জরুরি, সে বিষয়টি জেনে নিন।
ডায়াবেটিসের আগাম উপস্থিতি শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত রোগীদের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরীক্ষা করানো আবশ্যক। বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে এই সময়সূচীকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. যাঁদের এখনও ডায়াবেটিস হয়নি (সুস্থ ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের জন্য)
- ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে: আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (ADA)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী সুস্থ ব্যক্তিদের অন্তত বছরে ১ বার খালি পেটে (Fasting) এবং খাওয়ার পর (PP) রক্তে সুগারের মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত। পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকলে প্রতি ১ থেকে ৩ বছর পর পর আবার স্ক্রিনিং করানো যেতে পারে।
- ৩৫ বছরের কম বয়সী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি: বয়স ৩৫-এর কম হলেও যদি কারও ওজন অতিরিক্ত বেশি থাকে (BMI বেশি), পরিবারে পিতা-মাতা বা ভাই-বোনের ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে, উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল থাকে, তবে তাঁদেরও বছরে অন্তত ১ বার রক্ত পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।
২. যাঁদের প্রি-ডায়াবেটিস (Pre-diabetes) রয়েছে
যাঁদের রক্তের শর্করার মাত্রা একদম স্বাভাবিক নয়, আবার পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিস হওয়ার মাত্রাতেও পৌঁছায়নি (Fasting Blood Sugar ১০০-১২৫ mg/dL-এর মধ্যে), তাঁদের ‘প্রি-ডায়াবেটিক’ বলা হয়।
- প্রি-ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ৬ মাস পর পর অন্তত একবার ব্লাড সুগার পরীক্ষা করানো উচিত। এর মাধ্যমে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে কতটুকু উন্নতি হলো তা সহজে পরিমাপ করা যায়।
৩. যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে (আক্রান্ত রোগীদের জন্য)
{{/usCountry}}যাঁদের রক্তের শর্করার মাত্রা একদম স্বাভাবিক নয়, আবার পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিস হওয়ার মাত্রাতেও পৌঁছায়নি (Fasting Blood Sugar ১০০-১২৫ mg/dL-এর মধ্যে), তাঁদের ‘প্রি-ডায়াবেটিক’ বলা হয়।
- প্রি-ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ৬ মাস পর পর অন্তত একবার ব্লাড সুগার পরীক্ষা করানো উচিত। এর মাধ্যমে জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে কতটুকু উন্নতি হলো তা সহজে পরিমাপ করা যায়।
৩. যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে (আক্রান্ত রোগীদের জন্য)
{{/usCountry}}যাঁরা আগে থেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য ডায়াবেটিস মনিটরিং অত্যন্ত নিয়মিত হতে হবে।
- HbA1c টেস্ট (গত ৩ মাসের গড় সুগার পরীক্ষা):
- যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং রক্তের শর্করা স্বাভাবিক সীমায় থাকে, তবে প্রতি ৬ মাস পর পর (বছরে ২ বার) HbA1c টেস্ট করাতে হবে।
- কিন্তু যদি সুগার অনিয়ন্ত্রিত থাকে, ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা হয় বা ইনসুলিন নেওয়া শুরু হয়, তবে প্রতি ৩ মাস পর পর (বছরে ৪ বার) এই পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক।
- দৈনন্দিন বা সাপ্তাহিক হোম মনিটরিং (গ্লুকোমিটারের সাহায্যে): ইনসুলিন নির্ভর (Type 1) রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন ১ থেকে একাধিকবার গ্লুকোমিটার দিয়ে সুগার মাপা দরকার। তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীরা সপ্তাহে অন্তত ১ থেকে ২ দিন বা মাসে ২-৩ বার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে (যেমন খালি পেটে এবং খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর) ঘরে বসে গ্লুকোমিটারে সুগার মেপে ডায়রিতে লিখে রাখতে পারেন।
৪. গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে (Gestational Diabetes)
গর্ভকালীন সময়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেকের সুগার বেড়ে যায়। তাই গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে প্রতিটি নারীর জন্য 'ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট' (OGTT) করানো অত্যন্ত জরুরি। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অত্যন্ত ঘন ঘন (প্রয়োজনে প্রতিদিন) সুগার চেক করতে হয়।
কখন নির্ধারিত সময়ের আগেই টেস্ট করানো জরুরি?
যদি কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচী পূর্ণ নাও হয়, তবুও নিচে বর্ণিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানো উচিত:
- ঘন ঘন তৃষ্ণা পাওয়া এবং রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া।
- অতিরিক্ত খিদে লাগা সত্ত্বেও দ্রুত শরীরের ওজন কমতে থাকা।
- চোখ ঝাপসা হয়ে আসা বা হাত-পায়ে ঝিনঝিন ও অসাড় ভাব অনুভুত হওয়া।
- শরীরে কোনো ছোটখাটো কেটে যাওয়া বা ঘা সহজে শুকাতে না চাওয়া।
ডায়াবেটিস কোনো ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, একে সচেতনতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করাই আসল কৌশল। নিজের বয়স ও শারীরিক ঝুঁকি বিবেচনা করে সঠিক সময় অন্তর নিয়মিত পরীক্ষা করালে যেকোনো বড় জটিলতা থেকে মুক্ত থেকে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব।