ভারতের বড় শহরগুলোতে কাশি এখন দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে । দূষণ, ঋতুগত সংক্রমণ এবং দীর্ঘ সময় জনাকীর্ণ পথে যাতায়াতের কারণে শ্বাসকষ্ট বা কাশির মতো সমস্যাগুলো এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে, মানুষ একে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না । কিন্তু এই অবহেলাই ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তকরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ।

বায়ুদূষণ ও ফুসফুসের স্বাস্থ্যের অবনতি
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ভারতের বড় শহরগুলোতে বাতাসের মান অত্যন্ত 'অস্বাস্থ্যকর' পর্যায়ে রয়েছে । উচ্চমাত্রার PM2.5 ঘনত্ব শিশু ও বৃদ্ধদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করছে । দীর্ঘস্থায়ী এই দূষণ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাইরের বায়ুদূষণ এখন তামাকের মতোই বিপজ্জনক একটি 'গ্রুপ ১ কার্সিনোজেন' বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান ।
বদলে যাওয়া রোগীর প্রোফাইল
একটা সময় ধারণা করা হতো কেবল ধূমপায়ীদেরই ফুসফুসের ক্যানসার হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। এশিয়ায় ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে প্রায় ৬০-৮০ শতাংশই জীবনে কোনোদিন ধূমপান করেননি । ধূমপান এখনও বড় কারণ হলেও, বায়ুদূষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব এখন সমান্তরালভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে । ভারতে মোট ক্যানসার আক্রান্তের মধ্যে ৫.৮ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার এবং ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ৮ শতাংশেরও বেশি এই রোগের কারণে ঘটে ।
প্রাথমিক লক্ষণসমূহ: যা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়
{{/usCountry}}প্রাথমিক লক্ষণসমূহ: যা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়
{{/usCountry}}ফুসফুসের ক্যানসারের চ্যালেঞ্জ হলো এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব একটা প্রকট হয় না । কেবল দীর্ঘস্থায়ী কাশিই নয়, আরও অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে:
- সামান্য পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট হওয়া ।
- অকারণে ক্লান্তি বা বুকে অস্বস্তি অনুভব করা ।
- গলার স্বর বসে যাওয়া বা কর্কশ হওয়া ।
- হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া ।
- বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া ।
দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী মানুষ এই লক্ষণগুলোকে সাধারণ অ্যালার্জি বা দূষণের প্রভাব ভেবে ভুল করেন এবং চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করে ফেলেন।
দ্রুত শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা
ভারতে প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হয় । অথচ প্রথম দিকে ধরা পড়লে এই রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা সবথেকে বেশি থাকে । দেরি হওয়ার ফলে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়, যা চিকিৎসাকে জটিল করে তোলে।
আধুনিক চিকিৎসা ও আশার আলো
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন ফুসফুসের ক্যানসারকে আর একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখা হয় না; বরং এর আণবিক বৈশিষ্ট্য ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয় । প্রথম দিকে ধরা পড়লে সার্জারি বা নির্দিষ্ট রেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব । এমনকি অ্যাডভান্সড স্টেজেও এখন ইমিউনোথেরাপি এবং টার্গেটেড ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে রোগীর আয়ু ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব হচ্ছে ।
যে কাশিকে আমরা অবহেলা করি, তা হয়তো বড় কোনো সমস্যার প্রথম সঙ্কেত । সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও সচেতনতা ফুসফুসের ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইতে আমাদের সবথেকে বড় হাতিয়ার হতে পারে । শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জীবনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে ।
(চিকিৎসক সুদীপ দাস মণিপাল হাসপাতাল কলকাতার মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের প্রধান এবং কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট)