Bengal Industrial Policy Expectation: পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ও শিল্প ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন ও সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসতে চলেছে আগামী ৫ নভেম্বরের বহু প্রতীক্ষিত শিল্পনীতি ঘোষণা। রাজ্যকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে এবং রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে এই নতুন শিল্পনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। শিল্পমহলের বার্তা স্পষ্ট— দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একক জানালা নীতি বা সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স নীতি, সুদৃঢ় পরিকাঠামো এবং বিশেষ আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেলে পশ্চিমবঙ্গ খুব দ্রুত দেশের শিল্প মানচিত্রে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। রাজ্যের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠীগুলির প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আগামীর এই সম্ভাবনাময় রূপরেখা।
একক জানালা ব্যবস্থা ও সহজ বিনিয়োগ পরিবেশ

রাজ্যের শিল্প বিকাশকে আরও দ্রুত ও গতিশীল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে আসে জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। শিল্পপতিদের মতে, সহজ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জমি বণ্টন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত ছাড়পত্র প্রদান এবং 'সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স' চালু হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বিষয়টি নিয়ে অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়া এই প্রসঙ্গের ওপর জোর দিয়ে জানিয়েছেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একক জানালা ছাড়পত্রের মাধ্যমে প্রস্তাবিত বিনিয়োগকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সহজতর হবে। সহজ উপায়ে জমি লাভ, নির্ভরযোগ্য পরিকাঠামো এবং শিল্পমুখী দক্ষতার প্রশিক্ষণ যুক্ত হলে রাজ্যের শিল্পে এক নতুন গতি সঞ্চারিত হবে। তাঁর মতে, এর সবচেয়ে বড় সুফল পাবে রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম, যাঁরা কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে না গিয়ে নিজের রাজ্যেই চাকরি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাবে।
সবুজ শক্তি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অপার সম্ভাবনা
শিল্প মহলের মতে, শক্তি খাতের সংস্কার ছাড়া বড় শিল্পের অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন এনার্জির ব্যবহারের ওপর বর্তমান বিশ্বে সবথেকে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চলের কোল-বেড মিথেন (CBM) এবং শেল গ্যাস রাজ্যের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে।
{{/usCountry}}শিল্প মহলের মতে, শক্তি খাতের সংস্কার ছাড়া বড় শিল্পের অগ্রগতি সম্ভব নয়। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন এনার্জির ব্যবহারের ওপর বর্তমান বিশ্বে সবথেকে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চলের কোল-বেড মিথেন (CBM) এবং শেল গ্যাস রাজ্যের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিতে পারে।
{{/usCountry}}গ্রেট ইস্টার্ন এনার্জি কর্পোরেশন লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রশান্ত মোদী জানিয়েছেন, ভারতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, রানিগঞ্জের বিপুল সঞ্চয় তা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। গেইলের (GAIL) পাইপলাইন নেটওয়ার্ক তৈরি থাকায় নতুন উৎপাদিত গ্যাস দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব। শিল্পনীতিতে প্রাকৃতিক গ্যাসকে যদি শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং 'সেলফ-সার্টিফিকেশন'-এর মাধ্যমে ছাড়পত্র মিললে রাজ্যে প্রচুর নতুন বিনিয়োগ আসবে। এর ফলে একদিকে যেমন দূষণমুক্ত শক্তি মিলবে, তেমনই স্থানীয় স্তরে নতুন পরিকাঠামো ও কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কোল্ড চেইনে বিপ্লব
কৃষিপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও এফএমসিজি (FMCG) সেক্টর কর্মসংস্থান তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হতে পারে। কেভেন্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মায়াঙ্ক জলানের মতে, পশ্চিমবঙ্গ কেবল রাজ্যের প্রয়োজন মিটিয়ে পুরো পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের 'হাব' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এর জন্য দরকার স্বচ্ছ জমি নীতি এবং কোল্ড চেইনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বড় অংশ কোল্ড চেইনে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাই বিদ্যুতের শুল্কে বিশেষ ভর্তুকির দাবি জানিয়েছেন শিল্পপতিরা। এছাড়া বিভিন্ন ফুড পার্কে প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে পরিকাঠামো এবং সময়ভিত্তিক একক ছাড়পত্র পেলে রাজ্য খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে দেশের শীর্ষ তালিকায় প্রবেশ করবে।
রিয়েল এস্টেট, লজিস্টিকস ও পরিকাঠামোর বিকাশ
শিল্পের বিকাশ ঘটলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে রাজ্যের রিয়েল এস্টেট, ওয়্যারহাউসিং ও লজিস্টিকস সেক্টরে। পুর্তি রিয়েলটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মহেশ আগরওয়ালের মতে, প্রস্তাবিত শিল্পনীতিতে স্ট্যাম্প ডিউটি, এসজিএসটি (SGST) রিইমার্সমেন্ট, সুদে ভর্তুকি এবং ইপিএফ (EPF) সাপোর্টের মতো আর্থিক উৎসাহ থাকলে নতুন উৎপাদন শিল্পে জোয়ার আসবে। কারখানা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, লজিস্টিকস হাব, গুদামঘর এবং বাণিজ্য পরিকাঠামোর চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে রিয়েল এস্টেট খাত রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠবে।
আগামীর বার্তা
সারমর্মে শিল্প মহলের আশা, আগামী ৫ নভেম্বরের নয়া শিল্পনীতি পশ্চিমবঙ্গকে কেবল শিল্পে পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং এক ভবিষ্যৎমুখী, স্বাবলম্বী ও কর্মসংস্থানমুখী রাজ্যের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করবে। যা বাংলাকে পুনরায় দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক ও শিল্প কেন্দ্রে পরিণত করতে বেশি সময় নেবে না বলে আশাবাদী শিল্প মহল।