আমাদের শরীরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে যে কয়টি ভিটামিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ভিটামিন ‘এ’ (Vitamin A)। এটি একটি ফ্যাটে দ্রবণীয় (Fat-soluble) প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যা প্রধানত চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রখর রাখা, শরীরের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, প্রজনন স্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং ত্বককে সুস্থ ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভিটামিন 'এ'-র অভাব। কিন্তু আমরা অনেকেই দৈনন্দিন ব্যস্ততায় এই ভিটামিনের ঘাটতির প্রাথমিক লক্ষণগুলো এড়িয়ে যাই। শরীরে ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতির প্রধান লক্ষণগুলো কী কী, কীভাবে বুঝবেন আপনি এই সমস্যায় ভুগছেন এবং কোন কোন খাবারের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব—তা নিয়ে একটি বিস্তারিত বিশেষ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. শরীরে ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতির ৭টি প্রধান লক্ষণ
ক) রাতকানা রোগ (Night Blindness / Nyctalopia): ভিটামিন 'এ'-র অভাবের সবচেয়ে প্রথম ও প্রাথমিক স্পষ্ট লক্ষণ হলো রাতকানা রোগ। আলো কমে গেলে বা অন্ধকারে চোখে কম দেখা বা ঝাপসা দেখার সমস্যা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত ভিটামিন 'এ'-র অভাবে চোখের রেটিনায় ‘রোডোপসিন’ (Rhodopsin) নামক রঞ্জক তৈরি হতে পারে না, যার ফলে চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
খ) চোখ অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া (Dry Eyes / Xerophthalmia): ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতি দেখা দিলে চোখের জল তৈরি হওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে চোখ শুষ্ক বা খসখসে লাগে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জিরোফথ্যালমিয়া (Xerophthalmia) বলা হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা বজায় থাকলে কর্নিয়ায় ঘা বা আলসার পর্যন্ত হতে পারে, যা স্থায়ী অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়।
{{/usCountry}}খ) চোখ অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া (Dry Eyes / Xerophthalmia): ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতি দেখা দিলে চোখের জল তৈরি হওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে চোখ শুষ্ক বা খসখসে লাগে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জিরোফথ্যালমিয়া (Xerophthalmia) বলা হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা বজায় থাকলে কর্নিয়ায় ঘা বা আলসার পর্যন্ত হতে পারে, যা স্থায়ী অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়।
{{/usCountry}}গ) ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যাওয়া (Dry Skin and Eczema): আমাদের ত্বকের কোষগুলোর পুনর্গঠন ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে ভিটামিন 'এ' জাদুর মতো কাজ করে। শরীরে এর ঘাটতি হলে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, প্রাণহীন ও চামড়া খসখসে হয়ে পড়ে। অনেকেই একজিমা বা ত্বকের চরম শুষ্কতায় ভুগে থাকেন।
ঘ) ঘা বা ক্ষত দ্রুত না শুকানো (Slow Wound Healing): শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে বা আঘাত পেলে যদি ক্ষতস্থান শুকাতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে, তবে তা ভিটামিন 'এ'-র ঘাটতির কারণে হতে পারে। কোলাজেন (Collagen) তৈরিতে এই ভিটামিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
ঙ) বারবার ইনফেকশন বা সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়া: ভিটামিন 'এ'-কে বলা হয় আমাদের শরীরের ‘অ্যান্টি-ইনফেক্টিভ ভিটামিন’। এটি ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখে। এর অভাবে গলা, বুক বা পরিপাকতন্ত্রে বারবার ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে।
চ) মুখে অতিরিক্ত ব্রণ ও ফুসকুড়ি: ত্বকের ক্ষতিকর টিস্যু পুনর্গঠনে ভিটামিন 'এ' কাজ করে। শরীরে এর অভাব ঘটলে ত্বকে হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মুখে অনবরত একনে বা তীব্র ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়।
ছ) প্রজনন সমস্যা ও বাড়ন্ত শিশুর বিকাশ থমকে যাওয়া: গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই ভিটামিন 'এ' জরুরি। এই ভিটামিনের তীব্র ঘাটতি প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া বাড়ন্ত শিশুদের শরীরে এর অভাব হলে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
২. ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি কীভাবে পূরণ করবেন?
ভিটামিন 'এ' প্রধানত দুটি উৎস থেকে পাওয়া যায়—প্রাণিজ উৎস (Retinol) এবং উদ্ভিজ্জ উৎস (Beta-carotene)। সঠিক ডায়েট মেনে চললে খুব সহজেই এই ঘাটতি দূর করা সম্ভব।
উদ্ভিজ্জ উৎস (বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল):
- রঙিন সবজি: গাজর, মিষ্টি আলু, পাকা পাম্পকিন বা মিষ্টি কুমড়ো এবং টমেটোতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন থাকে, যা শরীরে গিয়ে ভিটামিন 'এ'-তে রূপান্তরিত হয়।
- সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, নটে শাক, মেথি শাক এবং ব্রকলি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন।
- পাকা ফল: পাকা পেঁপে, পাকা আম, কাঁঠাল এবং পাকা তরমুজ ভিটামিন 'এ'-র অন্যতম চমৎকার প্রাকৃতিক উৎস।
প্রাণিজ উৎস (রেটিনল সমৃদ্ধ খাবার):
- সামুদ্রিক মাছ ও রুই-কাতলার তেল: পুঁচকে বা ছোট মৌরলা মাছ, সামুদ্রিক মাছ এবং বিশেষ করে স্যালমন বা কড লিভার অয়েল (Cod Liver Oil)-এ প্রচুর ভিটামিন 'এ' থাকে।
- ডিমের কুসুম ও দুধ: ডিমের কুসুম, পূর্ণাঙ্গ গরুর দুধ, মাখন, পনির ও ছানা প্রতিদিন খেলে ভিটামিন 'এ'-র চাহিদা মেটে।
- কলিজা বা লিভার: খাসি বা মুরগির কলিজায় উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন 'এ' বিদ্যমান।
রান্নার সঠিক নিয়ম (ফ্যাট বা তেলের উপস্থিতি):
যেহেতু ভিটামিন 'এ' একটি ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন, তাই সবুজ শাকসবজি বা গাজর রান্নার সময় সামান্য তেল বা ঘি ব্যবহার করা উচিত। তেল বা ফ্যাটের সাথে খেলে শরীর খুব সহজে এই ভিটামিন শোষণ করতে পারে।
সতর্কতা: প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে ভিটামিন 'এ' গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সরাসরি উচ্চমাত্রার ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়, কারণ অতিরিক্ত ভিটামিন 'এ' লিভারের ক্ষতি করতে পারে।