বিশ্বের নানা প্রান্তে একসঙ্গে প্রতিবাদের ঢেউ। কোথাও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ, কোথাও বাসস্থানের আকাশছোঁয়া খরচ, আবার কোথাও শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ইতালি থেকে শুরু করে আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, তুরস্ক এবং আমেরিকা, একাধিক দেশে পথে নেমেছেন সাধারণ মানুষ। ভারতেও ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে চলছে রাজনৈতিক প্রতিবাদ। প্রতিবাদের ধরন আলাদা হলেও, তার পিছনে রয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই পরিস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, সাধারণ মানুষের অসন্তোষ কতটা চাপে ফেলতে পারে সরকারকে?
ফ্রান্সে মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষাক্ষেত্রেও ক্ষোভ

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফ্রান্সের সরকার। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে ক্ষোভের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো এবং স্কুলের পরিবেশের প্রতিবাদে পথে নেমেছেন শিক্ষক ও পড়ুয়ারা। প্যারিসে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অন্য এলাকাতেও। বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষের খবরও মিলেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দাবি, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিবাদে প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শুধু প্যারিসেই রাস্তায় নেমেছিলেন প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তার আগে এই বিক্ষোভ সরকারের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরোঁর পক্ষে আর নির্বাচনে লড়া সম্ভব নয়।
বেলজিয়াম থেকে পর্তুগাল, একই ছবি
বেলজিয়ামেও সংসারের খরচ বাড়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কায় আন্দোলনে নেমেছেন পড়ুয়ারা। পরে সেই প্রতিবাদ জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির বিরুদ্ধেও ছড়িয়ে পড়ে। ব্রাসেলস ও লিয়েজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর জলকামান ব্যবহার করা হয়।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বেতন বৃদ্ধির হার কম, অথচ বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়ার খরচ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৭ সালের পর থেকে লিসবন-সহ একাধিক শহরে সম্পত্তির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন তরুণ চাকরিজীবী এবং কম আয়ের পরিবারগুলি।
{{/usCountry}}পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বেতন বৃদ্ধির হার কম, অথচ বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়ার খরচ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৭ সালের পর থেকে লিসবন-সহ একাধিক শহরে সম্পত্তির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন তরুণ চাকরিজীবী এবং কম আয়ের পরিবারগুলি।
{{/usCountry}}ইতালিতেও একই ছবি। মূল্যবৃদ্ধি, বেতন না বাড়া এবং দৈনন্দিন খরচ সামলাতে না পেরে রাস্তায় নেমেছেন বহু মানুষ। মিলানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর মিলেছে।
বেকারত্বের আশঙ্কায় আলবেনিয়ার পড়ুয়ারা
আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চ শিক্ষার খরচ এবং আর্থিক সহায়তার অভাব ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তরুণ প্রজন্ম। ১৩ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রকের বাইরে বিক্ষোভ হিংসাত্মক চেহারা নেয়। বিক্ষোভকারীরা ভবন লক্ষ্য করে ইট ও কংক্রিটের টুকরো ছোড়েন। পুলিশও কড়া পদক্ষেপ করে। পরে আন্দোলনের দাবি ছড়িয়ে পড়ে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ও বেকারত্বের মতো বিষয়েও।
আমেরিকা, আর্জেন্টিনা, তুরস্কেও বিক্ষোভ
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতায় ‘নো কিংস’ নেটওয়ার্কের উদ্যোগে একাধিক শহরে মিছিল হয়েছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটদানে মানুষকে উৎসাহিত করাও এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন এবং বিরোধীরা বিক্ষোভ করেছেন। অন্য দিকে, তুরস্কে মূল্যবৃদ্ধি এবং অপর্যাপ্ত পেনশনের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলি।
ভারতে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে বিরোধী দল এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রতিবাদে নেমেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সব মিলিয়ে, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলাদা হলেও মানুষের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে কয়েকটি অভিন্ন সমস্যা। মূল্যবৃদ্ধি, বাসস্থানের খরচ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি পরিষেবায় কাটছাঁট। এই ক্ষোভ আগামী দিনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেটাই দেখার।