পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির গণ্ডি পেরিয়ে এ বার ভারত মহাসাগরেও যুদ্ধের আঁচ পৌঁছতে পারে—এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেইয়ের সামরিক উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকা ফের হামলা চালালে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর আরও বাড়তে পারে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিয়োয় সাফাভি দাবি করেছেন, সংঘাত ইতিমধ্যেই পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। নতুন করে হামলা হলে তা ভারত মহাসাগর এবং তারও বাইরে পৌঁছতে পারে।
সাফাভির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডও সম্প্রতি জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তারা অস্ত্র, কৌশল এবং লক্ষ্য বদলাতে পারে। অর্থাৎ, সংঘাতকে শুধু স্থলভাগ বা পারস্য উপসাগরের মধ্যে আটকে না রেখে সমুদ্রপথে আরও বিস্তৃত করার বার্তাই দিচ্ছে তেহরান।
ভারত মহাসাগরের দিকে নজর পড়ার কারণও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশাল জলভাগ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস বেরিয়ে আরব সাগর হয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়। অন্য দিকে, বাব-এল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এই দুই সরু জলপথে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়াতে পারে।
ইতিমধ্যেই তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১৭টি পণ্যবাহী জাহাজ পার হয়েছে। তার আগের সপ্তাহে সংখ্যাটি ছিল ৩৭। যুদ্ধের আগে এই পথে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি জাহাজ চলাচল করত। বাব-এল-মান্দেব দিয়েও জাহাজ চলাচল কমেছে। অর্থাৎ নিরাপত্তা-উদ্বেগে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে ইতিমধ্যেই চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশ বিদেশ থেকে আনা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণ সেল বা পিপিএসি-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮৮ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল আনার পথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আমদানি খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
{{/usCountry}}ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশ বিদেশ থেকে আনা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণ সেল বা পিপিএসি-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮৮ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল আনার পথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আমদানি খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
{{/usCountry}}ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়েছে। সেপ্টেম্বরে ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ঝুড়ির গড় দাম ১০২.১১ ডলার প্রতি ব্যারেলে উঠেছিল। আগস্টে এই গড় ছিল ৯০.১৯ ডলার এবং জুলাইয়ে ৮২.০৪ ডলার। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডও ১০০ ডলারের উপর উঠেছে। ফলে তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি বিল, বাণিজ্য ঘাটতি এবং টাকার দামের উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে ভারত শুধু হরমুজের উপর নির্ভর করে নেই। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ভারতীয় পরিশোধন সংস্থাগুলি রাশিয়া, ইরাক, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কিছু সরবরাহ হরমুজের বিকল্প রুট বা অফশোর ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমেও চালু রাখা হচ্ছে।
তার পরেও ভারত মহাসাগরের দিকে সংঘাত ছড়ালে শুধু তেলের বাজার নয়, জাহাজ চলাচল, বিমা খরচ, এলএনজি পরিবহণ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। এখন সাফাভির হুঁশিয়ারি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, নাকি তা কেবল কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরির বার্তা হিসাবেই থেকে যায়, সেটাই দেখার। তবে হরমুজ থেকে ভারত মহাসাগর—যুদ্ধের পরিসর বাড়ার আশঙ্কা নতুন করে সামনে আসায় নয়াদিল্লির নজর এখন আরব সাগর এবং তার সংলগ্ন সমুদ্রপথের দিকেও।