পাকিস্তানকে এবার সরাসরি কড়া বার্তা দিল আফগানিস্তানের তালিবান সরকার। আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মহম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের হামলা বা সামরিক অভিযান হলে তার জবাব দেওয়া হবে। তবে সেই জবাব হঠকারী হবে না, বরং পরিকল্পিত, দৃঢ় এবং পূর্ণ প্রস্তুতির সঙ্গে দেওয়া হবে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ ও সামরিক উত্তেজনা যখন ফের বাড়ছে, তখন তালিবানের এই হুঁশিয়ারিকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

মুজাহিদের বার্তা, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে পাকিস্তান কোনও পদক্ষেপ করলে ইসলামাবাদকে তার গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে। তালিবান নেতৃত্বের বক্তব্য, দেশের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড রক্ষার প্রশ্নে তারা কোনও আপস করবে না।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আফগান-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি-কে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই তলানিতে ঠেকেছে। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটিতে টিটিপি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে এবং সেখান থেকেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তালিবান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কাবুলের দাবি, টিটিপি-র কার্যকলাপ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং তার দায় আফগানিস্তানের নয়।
ফেব্রুয়ারিতে সংঘর্ষ পৌঁছয় ‘ওপেন ওয়ার’-এ
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। পাকিস্তান আফগানিস্তানের একাধিক এলাকায় বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদের দাবি ছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সক্রিয় জঙ্গিদের ঘাঁটি লক্ষ্য করেই এই অভিযান। এর পর আফগান তালিবান বাহিনীও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা করেন, দুই দেশের মধ্যে পরিস্থিতি ‘ওপেন ওয়ার’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাকিস্তান কাবুল, কান্দাহার এবং পাকতিয়া-সহ একাধিক এলাকায় হামলা চালায়। তালিবানও পাল্টা হামলার দাবি করে। এর ফলে সীমান্ত সংঘর্ষ কার্যত দুই দেশের সরাসরি সামরিক মোকাবিলায় পরিণত হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আলোচনার উদ্যোগও দেখা যায়।
ডুরান্ড লাইনও বড় সমস্যা
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্র। ডুরান্ড লাইন নিয়ে আফগানিস্তানের আপত্তি বহু পুরনো। সীমান্তের দু’পারে বসবাসকারী একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের যাতায়াত, জঙ্গি কার্যকলাপ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত উত্তেজনা তৈরি হয়।
{{/usCountry}}আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্র। ডুরান্ড লাইন নিয়ে আফগানিস্তানের আপত্তি বহু পুরনো। সীমান্তের দু’পারে বসবাসকারী একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের যাতায়াত, জঙ্গি কার্যকলাপ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত উত্তেজনা তৈরি হয়।
{{/usCountry}}এর সঙ্গে টিটিপি এবং আইএসআইএস-কে-র মতো জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তান মনে করে, আফগানিস্তানের তালিবান সরকার টিটিপির বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অন্যদিকে তালিবানের অভিযোগ, পাকিস্তান আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে বারবার সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ
দুই দেশের সংঘর্ষের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রাষ্ট্রসংঘের আফগানিস্তান মিশন UNAMA জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত সংঘর্ষে আফগানিস্তানে বহু সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চের মধ্যে UNAMA ১৮৫ জন বেসামরিক হতাহতের ঘটনা যাচাই করেছে—৫৬ জন নিহত এবং ১২৯ জন আহত। নিহত-আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন। UNAMA একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, সংঘর্ষের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছনোর ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে মুজাহিদের নতুন হুঁশিয়ারি দুই দেশের সংঘাতকে ফের বড় মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে নতুন করে সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে তালিবান কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই নজরে। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই সংঘাতের প্রভাব যথেষ্ট বড় হতে পারে।