চিনের পর এ বার বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় আগ্রহ দেখাল নেদারল্যান্ডস। নদী ব্যবস্থাপনা, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিতে চায় ইউরোপের এই দেশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই প্রস্তরকে স্বাগত জানিয়েছেন। আর তাতেই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে তিস্তা প্রকল্পের ভূকৌশলগত দিক। কারণ, এক দিকে বাংলাদেশের নদী পুনরুদ্ধার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা, অন্য দিকে ভারতের উত্তরবঙ্গের কাছে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির পরবর্তী পদক্ষেপে নজর রাখবে নয়াদিল্লি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী সিওয়ার্ড সিওয়ার্ডসমার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক। সেখানেই তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং তার বাস্তবায়নে কারিগরি সহযোগিতার বিষয়ে নেদারল্যান্ডসের আগ্রহকে স্বাগত জানান তিনি।
চিনের পাশাপাশি ইউরোপও
বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস, দুই দেশই বদ্বীপ অঞ্চল। সেই মিলের কথা তুলে ধরে তারেক জানান, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন রোধ এবং ভূমি পুনরুদ্ধারের মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জমি পুনরুদ্ধারে নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে বলে মনে করছে ঢাকা।
নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রীও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম নদী ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর উপরে জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ, তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্য সহযোগিতা শুধু নদী খনন বা বাঁধ নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর গতিপথ পরিচালনা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নও।
কেন উদ্বিগ্ন ভারত?
তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে ভারতের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে চিনের ভূমিকা। শিলিগুড়ি করিডর, যা চিকেনস নেক নামেও পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে চিনের পরিকাঠামোগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে তার কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েছে।
{{/usCountry}}তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে ভারতের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে চিনের ভূমিকা। শিলিগুড়ি করিডর, যা চিকেনস নেক নামেও পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে চিনের পরিকাঠামোগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলে তার কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েছে।
{{/usCountry}}তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চিনের অংশগ্রহণ তাই ভারতের কাছে নিছক উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয় নয়। প্রকল্পের অবস্থান এবং এই অঞ্চলে চিনের প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা, দুই দিক থেকেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিস্তা প্রকল্পের সঙ্গে চিনের যুক্ত থাকাই যে ভারতের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি বিপদ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে প্রকল্পের প্রকৃতি ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত খতিয়ে দেখা জরুরি।
গত জুনে তারেক রহমানের চিন সফরের পর দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সহযোগিতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাবে উঠে আসে। জলপ্রবাহের পূর্বাভাস, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ের কথা বলা হয়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কাজ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকে সাহায্য করার আশ্বাসও দেয় চিন।
বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের যুক্তি
ঢাকার বক্তব্য, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই তিস্তা মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। চিনের সহায়তা নেওয়ার উদ্দেশ্য ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা নয়। বরং নদীভাঙন, বন্যা এবং শুষ্ক মরসুমে জলের অভাবের মতো সমস্যার মোকাবিলা করাই মূল লক্ষ্য।
নেদারল্যান্ডসের আগ্রহ এই প্রকল্পে একাধিক দেশের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প সহযোগিতার পথ আরও প্রসারিত হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের রূপরেখা, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নে কোন দেশ কতটা ভূমিকা নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ভারতের কাছে তাই তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব দ্বিমুখী। এক দিকে রয়েছে উত্তরবঙ্গের নদী ও জলসম্পদ সংক্রান্ত স্বার্থ। অন্য দিকে রয়েছে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশে চিনের কৌশলগত প্রভাবের প্রশ্ন। নেদারল্যান্ডসের প্রবেশ সেই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করল।