দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের কড়া অভিযানের পর ফের বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘পেলেট গান’। সোমবারের বিক্ষোভে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেও দিল্লি পুলিশ তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, ঘটনাস্থলে মোতায়েন কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ফলে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আদৌ পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে।

পেলেট গান আসলে একটি পরিবর্তিত পাম্প-অ্যাকশন শটগান, যা একসঙ্গে শত শত ক্ষুদ্র ধাতব বা রাবারের বল (পেলেট) ছুড়ে দিতে সক্ষম। ট্রিগার টানার সঙ্গে সঙ্গেই কার্তুজটি বিস্ফোরিত হয়ে বহু ছোট পেলেট চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিকে তুলনামূলকভাবে ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে তৈরি করা হলেও অতীতে এর ব্যবহারে বহু মানুষের চোখ ও মুখে গুরুতর আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণেই মানবাধিকার সংগঠন এবং চিকিৎসকদের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন।
প্রাক্তন সিআরপিএফ অতিরিক্ত মহাপরিচালক এইচ. আর. সিং জানিয়েছেন, ২০০৯-১০ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে পাথর ছোড়া বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এই অস্ত্র তৈরি করে। সেই সময় নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে পাথর ও লঙ্কার গুঁড়ো ছোড়ার ঘটনায় বিকল্প ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে পেলেট গান চালু করা হয়। একই সময়ে ধোঁয়া তৈরির গ্রেনেডের মতো আরও কিছু সরঞ্জামও তৈরি করেছিল ডিআরডিও।
২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে পেলেট গানের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। সেই সময় শতাধিক সাধারণ মানুষের চোখে গুরুতর আঘাত লাগে, অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর থেকেই এই অস্ত্র নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
{{/usCountry}}২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে পেলেট গানের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। সেই সময় শতাধিক সাধারণ মানুষের চোখে গুরুতর আঘাত লাগে, অনেকেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর থেকেই এই অস্ত্র নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
{{/usCountry}}যদি দিল্লির সাম্প্রতিক বিক্ষোভে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে রাজধানীতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে এই অস্ত্র ব্যবহারের এটিই হবে প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। এর আগে ২০২১ সালের কৃষক আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনী মূলত কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট এবং জলকামান ব্যবহার করেছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ২০ থেকে ৩০ মিটার দূরত্ব থেকে ছোড়া হলে পেলেট কার্যকর হয়। তবে খুব কাছ থেকে ছোড়া হলে বা চোখের মতো স্পর্শকাতর স্থানে লাগলে তা মারাত্মক আঘাতের কারণ হতে পারে। তাই এই অস্ত্র ব্যবহার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করার নির্দেশ থাকে।
প্রাক্তন সিআরপিএফ আইজি বিক্রম সহগল জানান, পেলেট গান ‘লেস-লেথাল’ বা কম প্রাণঘাতী অস্ত্রের মধ্যে পড়ে। সাধারণত কাঁদানে গ্যাস বা অন্যান্য ভিড় নিয়ন্ত্রণের উপায় ব্যর্থ হলে শেষ বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনায় এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনও তথ্য নেই।
দিল্লি পুলিশের দাবি, তাদের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডারে পাম্প-অ্যাকশন পেলেট গান নেই। এই ধরনের অস্ত্র মূলত সিআরপিএফের র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ)-এর কাছে থাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কতটা বলপ্রয়োগ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের ঊর্ধ্বতন আধিকারিক এবং সিআরপিএফের কমান্ডার।
এদিকে, প্রাক্তন দিল্লি পুলিশ কমিশনার এস. এন. শ্রীবাস্তবও এই অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি সত্যিই পেলেট গান ব্যবহার করা হতো, তাহলে একসঙ্গে বহু মানুষের শরীরে একই ধরনের আঘাতের চিহ্ন দেখা যেত। বর্তমানে প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি নিশ্চিত নন যে দিল্লিতে এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দিল্লির বিক্ষোভে পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। যদিও প্রশাসনের তরফে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে, তবুও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যার দাবি জোরালো হচ্ছে।