কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই সামনে আসছে একটি বড় প্রশ্ন। মানুষ তৈরি করা এই প্রযুক্তি নিজে কি ভাল আর মন্দের তফাত বুঝতে পারবে? কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নৈতিকতার বিষয়টি কি বিবেচনা করতে পারবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এ বার ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাবিদদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে আমেরিকার এআই সংস্থা Anthropic। সেই আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন ভারতীয় হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ। তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী। তাঁকে সান ফ্রান্সিসকোয় Anthropic-এর সদর দফতরে নিয়ে গিয়ে বৈঠক করা হয়।

স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ নিউ ইয়র্কের Vedanta Society-এর প্রধান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে অনলাইনে সাক্ষাৎকারের জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল Anthropic। পরে তাঁকে সান ফ্রান্সিসকোর দফতরে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে একাধিক ঘণ্টা ধরে আলোচনা চলে। বৈঠকে ধর্মীয় চিন্তাবিদদের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অন্য ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন। মূল আলোচনা ছিল এআইয়ের নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং Anthropic-এর তৈরি Claude মডেলকে কী ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে।
বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ জানিয়েছেন, সেখানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গোপনীয়তার চুক্তি বা NDA-তে সই করতে হয়েছিল। ফলে আলোচনায় ঠিক কী কী প্রশ্ন উঠেছিল বা কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করতে পারেননি। তবে তাঁর কথায়, Claude-এর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নৈতিক এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নানা মত শোনা হয়েছিল। Anthropic-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও পুরো বৈঠক জুড়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন। উন্নত এআই কি ভবিষ্যতে শুধু নির্দেশ পালন করা একটি যন্ত্র থাকবে, নাকি তার নিজের মতো করে চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হতে পারে? সেই সঙ্গে তার কোনও ধরনের চেতনা বা আত্মপরিচয়ের ধারণা তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। Anthropic বিভিন্ন ধর্ম এবং দর্শনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে সেই জটিল প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে। ক্যাথলিক, ইহুদি, শিখ এবং ইভ্যাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টান ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গেও সংস্থাটি যোগাযোগ করেছে বলে জানা গিয়েছে।
{{/usCountry}}এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন। উন্নত এআই কি ভবিষ্যতে শুধু নির্দেশ পালন করা একটি যন্ত্র থাকবে, নাকি তার নিজের মতো করে চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হতে পারে? সেই সঙ্গে তার কোনও ধরনের চেতনা বা আত্মপরিচয়ের ধারণা তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। Anthropic বিভিন্ন ধর্ম এবং দর্শনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে সেই জটিল প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে। ক্যাথলিক, ইহুদি, শিখ এবং ইভ্যাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টান ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গেও সংস্থাটি যোগাযোগ করেছে বলে জানা গিয়েছে।
{{/usCountry}}Anthropic-এর এই ভাবনার সঙ্গে Claude-এর নিজস্ব নৈতিক কাঠামোরও যোগ রয়েছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে Claude's Constitution নামে একটি দীর্ঘ নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে Claude-এর আচরণ কেমন হওয়া উচিত, কী ভাবে নিরাপদ, সৎ এবং নৈতিক ভাবে কাজ করা উচিত, তার নীতিগুলি তুলে ধরা হয়েছে। নথিটির প্রধান লেখক Anthropic-এর অ্যামান্ডা আস্কেল। এই কাঠামোর মধ্যে নৈতিকতা, সততা, নিরাপত্তা এবং মানুষের প্রতি ক্ষতিকর আচরণ এড়িয়ে চলার মতো বিষয় রয়েছে।
এখানেই স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দের মতো বেদান্ত চিন্তাবিদের গুরুত্ব। প্রযুক্তিবিদেরা মূলত কোড, তথ্য এবং নিরাপত্তার দিকটি দেখলেও ধর্ম ও দর্শনের জগৎ মানুষ, চেতনা, নৈতিকতা এবং ভাল জীবনের মতো প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করে এসেছে। Anthropic-এর এই উদ্যোগ তাই শুধু এআইকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা নয়, তাকে মানুষের মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়, সেই ভাবনাকেও সামনে আনছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন সিলিকন ভ্যালির একটি এআই সংস্থার সঙ্গে এক হিন্দু সন্ন্যাসীর এমন গোপন বৈঠক নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। Claude কী শিখবে, কী ভাবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং ভবিষ্যতে মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে, সেই উত্তর খুঁজতেই হয়তো প্রযুক্তির দুনিয়াকে এখন দর্শনের দরজায়ও কড়া নাড়তে হচ্ছে।