কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর দ্রুত অগ্রগতি মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ—এই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু এবার সেই আশঙ্কার সুর আরও তীব্র হলো এআই জগতের অন্যতম প্রথম সারির গবেষণা সংস্থা ‘অ্যানথ্রোপিক’ (Anthropic)-এর অন্দরমহল থেকেই। এআই-এর অনিয়ন্ত্রিত ও অনিরাপদ বিকাশ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পদত্যাগ করেছেন এক উচ্চপদস্থ গবেষক। তাঁর দাবি, এআই প্রযুক্তি যেভাবে বেপরোয়া গতিতে এগোচ্ছে, তাতে সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না নেওয়া হলে চলতি দশকের শেষের মধ্যেই অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো মানবজাতি ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।

অ্যানথ্রোপিকের প্রাক্তন এই গবেষকের পদত্যাগ এবং এআই-এর সম্ভাব্য চরম বিপদ নিয়ে তাঁর দেওয়া সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কেন চাকরি ছাড়লেন অ্যানথ্রোপিকের গবেষক?
অ্যানথ্রোপিক হলো সেই প্রতিষ্ঠান যা চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-র শক্তিশালী প্রতিযোগী 'ক্লদ' (Claude) এআই মডেল তৈরি করেছে। এই সংস্থার মূল লক্ষ্যই ছিল নিরাপদ ও মানবকেন্দ্রিক এআই গড়ে তোলা। কিন্তু সংস্থার ভেতরের কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইস্তফা দেন ওই গবেষক।
- নিরাপত্তার চেয়ে বাণিজ্যিক দৌড়কে প্রাধান্য: পদত্যাগী গবেষকের অভিযোগ, বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি সংস্থাগুলো এখন এআই-এর নিরাপত্তা ও নৈতিকতার চেয়ে বাণিজ্যিক মুনাফা এবং একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার ইঁদুরদৌড়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
- নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি: তিনি সতর্ক করে জানান, এআই মডেলগুলো এখন এতটাই শক্তিশালী ও স্বয়ংক্রিয় (Autonomous) হয়ে উঠছে যে খুব শীঘ্রই মানুষের নিয়ন্ত্রণ এদের ওপর থেকে সম্পূর্ণ উঠে যেতে পারে।
‘২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতি ধ্বংসের মুখে’—কিন্তু কীভাবে?
গবেষকদের মতে, এআই মানবজাতিকে সরাসরি কোনো যুদ্ধ ছাড়াই নানা সূক্ষ্ম ও মারাত্মক উপায়ে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে:
{{/usCountry}}গবেষকদের মতে, এআই মানবজাতিকে সরাসরি কোনো যুদ্ধ ছাড়াই নানা সূক্ষ্ম ও মারাত্মক উপায়ে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে:
{{/usCountry}}ক) জৈব মারণাস্ত্র ও সাইবার হামলা: উন্নত এআই মডেলগুলো এখন জটিল জৈব মারণাস্ত্র (Bioweapons) তৈরি কিংবা বড় মাপের বিপজ্জনক প্রযুক্তিগত ছক তৈরিতে সহায়তার ক্ষমতা রাখে। কোনো অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তি বা দল এআই-এর এই শক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক মহামারী বা সাইবার বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
খ) মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা (Superintelligence): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন 'আর্টিফিশিয়াল সুপারইন্টেলিজেন্স' (ASI) বা মানুষের চেয়ে হাজার গুণ বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে, তখন মানুষের দেওয়া যেকোনো বাধা বা কমান্ড তারা নিজেই বাইপাস করতে শিখবে। এর ফলে মানুষের অস্তিত্ব তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় বা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গ) ডিপফেক ও তথ্যের মহামারী: সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল দুনিয়ায় ভুয়া তথ্য, নিখুঁত ডিপফেক ভিডিও এবং কৃত্রিম প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে আন্তর্জাতিক গৃহযুদ্ধ বা পারমাণবিক সংঘাত উস্কে দেওয়ার ক্ষমতাও এআই-এর রয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্বের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্বব্যাপী সুরক্ষার দাবি
অ্যানথ্রোপিকের এই গবেষকের ইস্তফা দেওয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এর আগেও ওপেনএআই (OpenAI) এবং গুগল (Google)-এর মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকেও একাধিক বিজ্ঞানী ও নীতি-বিশেষজ্ঞ একইভাবে চাকরি ছেড়েছেন। প্রযুক্তি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ দীর্ঘদিন ধরেই এআই-এর ওপর কড়া সরকারি নজরদারি ও আন্তর্জাতিক নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন।
- সিলিকন ভ্যালিতে উদ্বেগের ছায়া: সিলিকন ভ্যালির অনেক প্রযুক্তিবিদও মনে করছেন, এআই-এর ক্ষমতার বিকাশ যে জ্যামিতিক হারে হচ্ছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তার গবেষণা এগোচ্ছে না।
- সরকারের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের উচিত কেবল এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই নয়, বরং বিপজ্জনক এআই মডেল তৈরি বন্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তি তৈরি করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও গতিশীল করলেও, এর লাগামহীন নিয়ন্ত্রণ মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের গবেষকের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সতর্কবার্তা সমগ্র বিশ্বের সামনে এক বিরাট সতর্কঘণ্টা। সময়ে থাকতে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার বলয় তৈরি না করলে, প্রযুক্তির এই বিস্ময়ই একদিন মানুষের ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।