পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন। এবার একই ব্যক্তির হাতে আসছে স্থল, নৌ এবং বায়ুসেনার কমান্ড। পাকিস্তানের সংসদে পাশ হয়েছে নতুন প্রতিরক্ষা আইন। সেই আইনের জেরেই তৈরি হয়েছে ‘চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস’ বা CDF নামে নতুন পদ। প্রথম CDF করা হয়েছে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে। সেনাপ্রধানের দায়িত্বও তাঁর হাতেই থাকছে।

১৯৭৬ সালের পর এই পরিবর্তনকে পাকিস্তানের সামরিক কমান্ড কাঠামোর সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য ছিল জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ। কিন্তু সেই পদে থাকা কোনও আধিকারিকের তিন বাহিনীকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার আইনি ক্ষমতা ছিল না।
নতুন আইনে সেই পরিস্থিতিই বদলে গেল। CDF এখন তিন বাহিনীর উপর অপারেশনাল কমান্ড চালাতে পারবেন। অর্থাৎ প্রয়োজন হলে সেনা, নৌসেনা এবং বায়ুসেনাকে একই নির্দেশ দিতে পারবেন তিনি। CDF সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রিপোর্ট করবেন।
পাকিস্তানের এক অবসরপ্রাপ্ত থ্রি-স্টার জেনারেলের বক্তব্য, নতুন আইনে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে মাঠে থাকা সামরিক ইউনিট পর্যন্ত কমান্ডের একটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, পুরনো ব্যবস্থার তুলনায় CDF-এর হাতে এখন অনেক বেশি বাস্তব ক্ষমতা।
এই পরিবর্তন নিয়ে অবশ্য বিতর্কও শুরু হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, এর ফলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে? কারণ, নতুন ব্যবস্থায় তিন বাহিনীর শীর্ষ কাঠামো কার্যত সেনাকেন্দ্রিক হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পারমাণবিক বাহিনীর কমান্ডও সেনার হাতেই থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ব্যবস্থার উপর স্থলসেনার প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
{{/usCountry}}বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পারমাণবিক বাহিনীর কমান্ডও সেনার হাতেই থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ব্যবস্থার উপর স্থলসেনার প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
{{/usCountry}}আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে নৌসেনা ও বায়ুসেনার ভবিষ্যৎ নিয়েও। তাঁদের শীর্ষ আধিকারিকদের বদলি, পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সেনা নেতৃত্বের প্রভাব বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
তবে এই আইনের পক্ষে অন্য যুক্তিও রয়েছে। পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য, আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র বদলে গিয়েছে। এখন শুধু স্থল, নৌ বা আকাশে আলাদা ভাবে লড়াই হয় না। সাইবার হামলা, ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি একই অভিযানের অংশ। তাই তিন বাহিনীর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় জরুরি।
সরকারের দাবি, নতুন কাঠামোর তিনটি প্রধান লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, স্থল, জল, আকাশ, সাইবার এবং ড্রোন অভিযানে সমন্বয় বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, তিন বাহিনীর মধ্যে পুরনো আলাদা কাজের পদ্ধতি কমানো। তৃতীয়ত, কোনও বড় সঙ্কটের সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
তবে নাগরিক সরকারের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, CDF-এর হাতে বাড়তি প্রশাসনিক ক্ষমতা গেলে সামরিক নেতৃত্ব আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শীর্ষ সামরিক আধিকারিকদের সরানো বা নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন আইনের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অন্য দিকে, আইনের সমর্থকেরা বলছেন, বিশ্বের একাধিক দেশে একই ধরনের সমন্বিত সামরিক কাঠামো রয়েছে। তাঁদের মতে, নতুন ব্যবস্থা মূলত যুদ্ধের সময় দ্রুত এবং একক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার জন্য তৈরি।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এল। আসিম মুনির এখন শুধু সেনাপ্রধান নন। দেশের তিন বাহিনীর সর্বোচ্চ অপারেশনাল কমান্ডও তাঁর হাতে। ফলে আগামী দিনে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এই পরিবর্তনের প্রভাব কতটা পড়ে, এখন সেটাই দেখার।